কালীপুজো মানেই আলো, আনন্দ আর মিষ্টিমুখ। কাজু বরফি, লাড্ডু বা রকমারি মিষ্টি, উৎসবের মরশুমে প্রিয় মিষ্টি থেকে দূরে থাকা কঠিন। কিন্তু ডায়াবেটিস থাকলে মিষ্টি খাওয়ার আগে দু’বার ভাবতে হয় অনেককেই। কখনও রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার ভয়, কখনও আবার উৎসবের আনন্দে খাবারের নিয়মে বদলের আশঙ্কা।
তবে ডায়াবেটিস রয়েছে মানেই সব মিষ্টি চিরতরে বাদ দিতে হবে, এমন নয়। বরং মিষ্টির পরিমাণ, সারা দিনের খাবারের ধরন, শারীরিক সক্রিয়তা এবং ওষুধ খাওয়ার নিয়মের দিকে নজর রাখলে অনেকটাই সচেতন থাকা সম্ভব। তা হলে দীপাবলিতে মিষ্টিমুখ করবেন কীভাবে, যাতে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টাও ব্যাহত না হয়?
মিষ্টি খান, তবে পরিমাণ বুঝে
লাড্ডু, কাজু বরফি, পছন্দের মিষ্টি একেবারে বাদ না দিয়েও উৎসব উপভোগ করা যায়। তবে একসঙ্গে অনেকটা মিষ্টি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তাই একাধিক মিষ্টি অল্প অল্প করে চেখে দেখার বদলে পছন্দের একটি মিষ্টি বেছে নিয়ে অল্প পরিমাণে খান। ধীরে ধীরে খাওয়ার অভ্যাসও কাজে আসতে পারে। মনে রাখবেন, মিষ্টি কতটা খেলেন, তার পাশাপাশি সারা দিনে মোট কতটা শর্করা গ্রহণ করছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

মিষ্টির জন্য খাবার বাদ দেবেন না
রাতের ভোজে মিষ্টি খাবেন বলে দুপুরের খাবার বাদ দেওয়া বা সারাদিন কম খেয়ে থাকার অভ্যাস বিপদ ডেকে আনতে পারে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে অতিরিক্ত খিদে পেতে পারে। ফলে উৎসবের রাতে একসঙ্গে অনেকটা খেয়ে ফেলার প্রবণতা তৈরি হয়। যাঁরা ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমিয়ে দিতে পারে এমন ওষুধ খান, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবার বাদ দিলে শর্করা বিপজ্জনক ভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খান। মিষ্টি খেতে চাইলে সেটিকে সারা দিনের খাদ্যতালিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাখুন।
শুধু মিষ্টি নয়, নজর রাখুন গোটা থালায়
দীপাবলির ভোজে লুচি, সিঙাড়া, নিমকি, আলুর নানা পদ আর মিষ্টি, সবই থাকে। এই খাবারগুলি একসঙ্গে বেশি পরিমাণে খেলে শরীরে কার্বোহাইড্রেটের মোট পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই খাবারের থালায় সবজি, ডাল, পনির, ডিম বা উপযুক্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। ভাত, রুটি ও আলুর মতো শর্করাসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণও বুঝে নিন। কারণ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ার পিছনে শুধু মিষ্টি দায়ী নয়, প্রতিদিনের অন্যান্য খাবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

পানীয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিনিও চিনুন
মিষ্টির পাশাপাশি প্যাকেটজাত ফলের রস, চিনির শরবত, মিষ্টি লস্যি বা অন্যান্য মিষ্টি পানীয় থেকেও শরীরে অতিরিক্ত শর্করা প্রবেশ করতে পারে। ফলে মিষ্টি কম খেলেও পানীয়ের মাধ্যমে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই চিনি ছাড়া পানীয়কে অগ্রাধিকার দিন। উৎসবের কোনও বিশেষ পানীয় খেতে চাইলে তাতে কতটা চিনি রয়েছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকুন।
খাওয়ার পরে হাঁটাচলা করুন
দীপাবলির ব্যস্ততায় শরীরচর্চার সময় বের করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু শারীরিক সক্রিয়তা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শারীরিক সমস্যা না থাকলে এবং চিকিৎসকের নিষেধ না থাকলে খাওয়ার পরে কিছুক্ষণ হাঁটুন। বাড়ির কাজে সাহায্য করা বা পরিবারের সঙ্গে হাঁটাচলাও সক্রিয় থাকার সুযোগ তৈরি করে। তবে ইনসুলিন বা নির্দিষ্ট কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধের কারণে রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে শরীরচর্চার আগে ও পরে কী কী সতর্কতা প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।

সুগার-ফ্রি মিষ্টি দেখেই নিশ্চিন্ত হবেন না
ডায়াবেটিস থাকলে সুগার-ফ্রি মিষ্টিকেই অনেকে সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প বলে মনে করেন। কিন্তু সুগার-ফ্রি মানেই কার্বোহাইড্রেট বা ক্যালরিমুক্ত নয়। মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণের উপর নির্ভর করে তাতেও এমন উপাদান থাকতে পারে, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেনার আগে প্যাকেটের পুষ্টিগুণ ও পরিবেশনের পরিমাণ দেখে নিন। আবার সাধারণ মিষ্টিও কারও কারও খাদ্যতালিকায় অল্প পরিমাণে জায়গা পেতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে তাঁর শারীরিক অবস্থা, ওষুধ এবং সামগ্রিক খাদ্য পরিকল্পনার উপর।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিষ্টি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল খাবারের পরিমাণ বুঝে খাওয়া, নিয়মিত ওষুধ নেওয়া এবং রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা। প্রত্যেকের শরীর ও চিকিৎসার প্রয়োজন আলাদা। তাই দীপাবলির খাদ্যতালিকা তৈরির সময় চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে চলুন। উৎসবের আনন্দ থাকুক, সেই সঙ্গে থাকুক স্বাস্থ্যের প্রতিও যত্ন।
