খাবার চিবোতে গিয়ে হঠাৎ দাঁতে চিনচিনে ব্যথা! কখনও ঠান্ডা জল খেলেই শিরশিরানি, কখনও আবার কোনও কারণ ছাড়াই শুরু হয় তীব্র যন্ত্রণা। দাঁতের ব্যথা এমনই এক সমস্যা, যা মুহূর্তে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে।
খাওয়াদাওয়া থেকে কথা বলা, এমনকী রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোনোও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেকেই ব্যথা কমাতে নিজের মতো ওষুধ খান বা ঘরোয়া টোটকার উপর ভরসা করেন। কিন্তু দাঁতে হঠাৎ ব্যথা শুরু হওয়া শরীরের একটি সতর্কবার্তা।
দাঁতের ক্ষয়, ফাটল, মাড়ির সংক্রমণ বা দাঁতের গোড়ায় পুঁজ জমার মতো নানা কারণে এই সমস্যা হতে পারে। তাই ব্যথার কারণ বুঝে চিকিৎসা করানো জরুরি। তবে দন্তচিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে কয়েকটি উপায়ে সাময়িক স্বস্তি পেতে পারেন।

হঠাৎ দাঁতে ব্যথা কেন হয়?
দাঁতের যন্ত্রণা সব সময় একই কারণে হয় না। ব্যথার ধরন এবং অবস্থান অনেক সময় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
দাঁতের ক্ষয়: দাঁতের উপরিভাগে ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয় তৈরি হয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে সেই ক্ষয় দাঁতের ভিতরের স্নায়ু ও রক্তনালিসমৃদ্ধ অংশে পৌঁছে যায়। তখন ঠান্ডা-গরম খাবার খেলে তীব্র শিরশিরানি বা ব্যথা হতে পারে।
দাঁতে চিড় বা ফাটল: শক্ত খাবার কামড়ানো, দুর্ঘটনায় মুখে আঘাত লাগা বা ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষার অভ্যাস থেকে দাঁতে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে। সেই ফাটল দিয়ে খাবারের কণা ও ব্যাকটেরিয়া ভিতরে পৌঁছলে ব্যথা শুরু হয়। অনেক সময় কামড় দেওয়ার সময়ই যন্ত্রণা বেশি অনুভূত হয়।
দাঁতের গোড়ায় সংক্রমণ: দাঁতের ভিতরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে গোড়ায় পুঁজ জমে ফোঁড়া তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে একটানা ব্যথা, মাড়ি ফুলে যাওয়া এবং কখনও জ্বরও দেখা দেয়। ব্যথা চোয়াল বা কান পর্যন্ত ছড়াতে পারে।
মাড়ির অসুখ: মাড়িতে দীর্ঘদিনের প্রদাহ বা সংক্রমণের কারণে মাড়ি দাঁত থেকে সরে যেতে পারে। ফলে দাঁতের গোড়ার সংবেদনশীল অংশ উন্মুক্ত হয়ে যায়। ঠান্ডা-গরমে শিরশিরানি এবং ব্যথা হতে পারে।
আক্কেল দাঁতের সমস্যা: মুখের ভিতরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে আক্কেল দাঁত ঠিকমতো বেরতে পারে না। আশপাশের মাড়িতে প্রদাহ, ফোলা এবং ব্যথা তৈরি হয়। কখনও পাশের দাঁতেও চাপ পড়ে।
পুরনো ফিলিং বা ক্যাপের ক্ষতি: দাঁতের পুরনো ফিলিং ভেঙে গেলে বা ক্যাপ আলগা হয়ে গেলে ভিতরের সংবেদনশীল অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে আচমকা ব্যথা শুরু হতে পারে।
সাইনাসের সংক্রমণ: সব দাঁতের ব্যথার উৎস মুখের ভিতরে নয়। সাইনাসে সংক্রমণ বা প্রদাহ হলে উপরের চোয়ালের একাধিক দাঁতে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। কারণ, উপরের দাঁতের গোড়া সাইনাসের কাছাকাছি অবস্থিত।

চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে কী করবেন?
হঠাৎ দাঁতে ব্যথা শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে এগুলি ব্যথার স্থায়ী চিকিৎসা নয়।
ব্যথা কমানোর ওষুধ: প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেনের মতো সাধারণ ব্যথানাশক সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্য ওষুধ খাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। অ্যাসপিরিন সরাসরি দাঁত বা মাড়িতে লাগাবেন না।
নুন-জলে কুলকুচি: এক গ্লাস ঈষদুষ্ণ জলে আধ চা-চামচ নুন মিশিয়ে ৩০ সেকেন্ড কুলকুচি করুন। এতে মুখের ভিতর পরিষ্কার রাখতে সুবিধা হয়। মাড়ির অস্বস্তিও কিছুটা কমতে পারে।
ঠান্ডা সেঁক দিন: বরফ একটি পরিষ্কার কাপড়ে মুড়ে গালের বাইরের দিকে ১৫-২০ মিনিট ধরে রাখুন। এতে ফোলা ও ব্যথা সাময়িকভাবে কমতে পারে। সরাসরি দাঁত বা মাড়িতে বরফ লাগাবেন না।
খাবার বাছুন বুঝেশুনে: ব্যথার দিক দিয়ে খাবার চিবোবেন না। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা খাবার, শক্ত খাবার এবং বেশি মিষ্টি এড়িয়ে চলুন। নরম খাবার খাওয়াই ভালো।
দাঁত পরিষ্কার রাখুন: ব্যথা হচ্ছে বলে দাঁত মাজা বন্ধ করবেন না। নরম ব্রাশ দিয়ে আলতো করে দাঁত পরিষ্কার করুন। দাঁতের ফাঁকে খাবার আটকে থাকলে সাবধানে ফ্লস ব্যবহার করুন।

কোন লক্ষণ দেখলে দেরি করা চলবে না?
দাঁতের ব্যথা এক-দু’দিনের বেশি স্থায়ী হলে বা ক্রমশ বাড়তে থাকলে দন্তচিকিৎসকের কাছে যান। মাড়ি ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া বা পুঁজ বেরনোর মতো লক্ষণ থাকলেও অপেক্ষা করা ঠিক নয়। জ্বর, মুখ খুলতে বা গিলতে অসুবিধা হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
মনে রাখবেন, ব্যথানাশক খেয়ে যন্ত্রণা কমে গেলেও দাঁতের ভিতরের সমস্যা থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে সংক্রমণ হলে তা আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সাময়িক স্বস্তির উপায়কে চিকিৎসার বিকল্প ভাববেন না। দাঁতের ব্যথার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে যথাসময়ে চিকিৎসা করানোই সুস্থ দাঁত ও মাড়ি বজায় রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়।
