Hashtagintro

প্যারীচাঁদ থেকে রবীন্দ্রনাথ, প্রেতচর্চায় অলৌকিক সব ঘটনার সাক্ষী মনীষীরা!

মৃত্যুর ওপারে কোন দেশ? সেখান থেকে কি ফেরা যায়? স্থায়ীভাবে না হলেও চকিতের জন্য? এই প্রশ্ন শুরু থেকেই ভাবিয়েছে সভ্যতাকে। আজও মৃত্যু পরবর্তী জগৎ আশ্চর্য ধোঁয়াশায় ঢাকা। বিজ্ঞান যতই বুক ঠুকে বলুক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি, রাজশেখর বসুর ‘মহেশের যাত্রা’র সংলাপ বেজে ওঠে, ”আছে আছে, সব আছে, সব সত্যি…” আর এই যে দ্বিধা, তা ভাবিয়েছে খোদ রবীন্দ্রনাথকেও। রবীন্দ্রনাথই বা কেন, প্যারীচাঁদ মিত্র, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, ঋষি অরবিন্দ- বাঙালির মনীষীদের অনেকেই বারবার জানতে চেয়েছেন জীবনের ওপারে কী রয়েছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয়ে যায় প্ল্যানচেটের চর্চা। আজ সেই চর্চা স্তিমিত হয়ে গেলেও প্রায় একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি বারবার ফিরে গিয়েছে প্ল্যানচেটের কাছে। চেষ্টা করেছে ইহজগতের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া সত্তাদের ‘সংকেত’কে বুঝতে!

প্যারীচাঁদ মিত্রকে আমরা চিনি টেকচাঁদ ঠাকুর নামেও। ‘আলাল ঘরের দুলাল’–এর রচয়িতাকে অনেকেই বাংলার প্রথম ঔপন্যাসিক বলেন। আসলে বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র আগেই তাঁর লেখা আখ্যানটিতেও উপন্যাসের ধর্ম ছিল বলেই অনেকের দাবি। যাই হোক, সে অন্য প্রসঙ্গ। শেষ জীবনে প্রবলভাবে পরলোকে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত ‘আজব নগরী’ নামের এক বইয়ে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন, ‘দেহত্যাগের পরে আত্মা সূক্ষ্ম শরীর ধারণ করে। ভক্তির সাহায্যে ও মনোযোগের একাগ্রতায় সেই আত্মার সহিত কথোপকথন সম্ভব।’ কেন তিনি পরলোক সম্পর্কে এভাবে মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন? তাঁর স্ত্রী বামাসুন্দরী দেবীর অকালমৃত্যুই আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল তাঁকে। একবার স্ত্রীকে দেখার আকুলতা থেকেই স্পিরিচুয়ালিজমের অনুসারী হয়ে পড়েন তিনি।

প্যারীচাঁদ মিত্র

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয়ে যায় প্ল্যানচেটের চর্চা। আজ সেই চর্চা স্তিমিত হয়ে গেলেও প্রায় একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি বারবার ফিরে গিয়েছে প্ল্যানচেটের কাছে।

দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ‘কলকাতার ভূত’ বইয়ে পাচ্ছি, প্যারীচাঁদের সঙ্গে নাকি তাঁর স্ত্রীর ছায়া-শরীরের সাক্ষাৎও হয়েছিল! বাড়ির অন্যরা ভয় পায় বলে রাতে খাওয়ার সময়টাই তিনি স্ত্রীকে ডাকতেন! পরে তাও বন্ধ হয়ে যায় অবশ্য। এই সব অভিজ্ঞতা থেকেই একাধিক ইংরাজি বইও লিখেছিলেন তিনি। জানা যায়, তাঁর সময় প্রেতচর্চার উপকরণ ছিল তিনকোনা কিংবা হৃদয়ের আকৃতির কাঠের তক্তা। এর নিচে দু’টি চাকা ও একপ্রান্তে একটি পেন্সিল লাগানো থাকত। আত্মা নেমে এলে প্ল্যানচেটে বসা সকলেই টের পেতেন নিজে নিজেই পেন্সিল চলতে শুরু করেছে! সেই পেনসিলের মাধ্যমেই নিজের সব কথা উগরে দিত আত্মা। ডিরোজিওর যুক্তিবাদী ছাত্র প্যারীচাঁদের এহেন চর্চা বুঝিয়ে দেয়, বিশ্বাস কীভাবে সময়ে সময়ে ভেঙে যায়, নতুন বাঁক নিয়ে তৈরি করে নতুন গতিপথ।

এবং রবীন্দ্রনাথ। কম বয়স থেকেই প্ল্যানচেটের (Planchette) অভ্যাস ছিল রবীন্দ্রনাথের। শোনা যায় কিশোর রবির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল সদ্যমৃত মাইকেল মধুসূদন দত্তের। এরপর, কুড়ি-একুশ বছর বয়সে ফের প্ল্যানচেট করা শুরু করেন তিনি। কিন্তু সেবারের আসর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কেননা অন্যতম উদ্যোক্তা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অকালপ্রয়াণ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র রবি ঠাকুরের চেয়ে প্রায় উনিশ বছরের বড় ছিলেন। বাবার আধ্যাত্মিক সহযোগী থাকা এই মানুষটিই নাকি ঠাকুরবাড়িতে প্রেতচর্চার পথিকৃত। তাঁর অকালপ্রয়াণ ১৮৮৪ সালে। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ একুশ। প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে আটষট্টির প্রৌঢ় রবীন্দ্রনাথ এক ‘মিডিয়ামে’র সংস্পর্শে আসেন। তিনি মোহিতচন্দ্র সেনের মেয়ে উমা দেবী। যাঁর ডাকনাম ছিল বুলা। অমিতাভ চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা’ বইয়ে বুলাকে ‘সুন্দরী, কৃশকায়া, কবি’ বলা হয়েছে।

Tallenge - Vintage Photograph Of A Young Rabindranath Tagore 1886- Small Poster (Paper,12 x 17 inches, MultiColour) : Rabindranath Tagore: Amazon.in: ...
তরুণ রবীন্দ্রনাথ

কম বয়স থেকেই প্ল্যানচেটের অভ্যাস ছিল রবীন্দ্রনাথের। শোনা যায় কিশোর রবির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল সদ্যমৃত মাইকেল মধুসূদন দত্তের। এরপর, কুড়ি-একুশ বছর বয়সে ফের প্ল্যানচেট করা শুরু করেন তিনি।

অমিতাভ লিখছেন- ‘শয়নকক্ষের মেঝেতে গোল হয়ে বসেন তাঁরা দুজনে।… স্তব্ধ বিস্ময়ে পাশে বসে থাকেন অন্তরঙ্গ কেউ কেউ।… আসর বসে কখনও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির তেতলায়, কখনও শান্তিনিকেতনে উদয়নে।… অন্যরা দর্শক, প্রশ্ন করেন শুধু রবীন্দ্রনাথ।… প্রার্থিত আত্মা ভর করেন উমা দেবীর দেহে। প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে অসম্ভব ক্ষিপ্রবেগে উমা দেবীর হাত দিয়ে কাছে রাখা খাতায় লেখা হয়ে যায় উত্তর। কোথাও কোন জড়তা নেই, নেই বক্তব্যের অসংলগ্নতা। তাছাড়া ইহজগতে যার যেমন মুখের ভাষা ছিল, সংলাপে যেন ঠিক তারই প্রকাশ এবং একজন যান তো আর একজন আসেন।’ জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তাঁর ‘নতুনদা’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ, প্রিয় ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ও হিতেন্দ্রনাথ, স্ত্রী মৃণালিনী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ। এসেছিলেন তাঁর ‘নতুন বউঠান’ও। কিন্তু তিনি তাঁর পরিচয় দেননি। যদিও রবীন্দ্রনাথ নিঃসংশয় ছিলেন, তিনিই এসেছেন। কেবল আত্মীয়রাই নন, অনুজপ্রতিম সুকুমার রায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রিয় পাত্ররাও এসেছিলেন সেই প্রেতচক্রের আহ্বানে। এই নিয়ে বিতর্কও কম নেই। যে মানুষটি নিজের সৃষ্টিতে ব্রহ্মাণ্ডের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দিয়েছেন চেতনাজাল, তাঁর কি প্রয়োজন ছিল প্রেতচর্চায় বসার?

এই যন্ত্রের সাহায্যে ডাকলে সত্যিই কি তারা আসে?

যাই হোক, ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রেতচর্চা কেবল নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে থিওজফিক্যাল সোসাইটির মতো সংস্থারও অবদান। ১৮৭৫ সালে নিউ ইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল থিওজফিক্যাল সোসাইটি। ১৮৭৯ সালে সোসাইটির নেতৃত্বে থাকা মানুষেরা এসে হাজির হন ভারতে। তার তিন বছর পরে ১৮৮২ সালে কলকাতাতেও থিওজফিক্যাল সোসাইটির শাখা গড়ে ওঠে কলকাতাতেও। সেই সময় প্যারীচাঁদ মিত্র, শিশিরকুমার ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বহু বিশিষ্টরা এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ঠাকুরবাড়ির স্বর্ণকুমারী দেবীও সদস্যপদ নেন। ধীরে ধীরে কলকাতা শহরে প্ল্যানচেটের চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। জানা যায়, মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের বাড়িতেও বসত আসর। এই বাড়ির এক হাড়হিম গল্পের কথাও এখানে বলা যাক।

রবীন্দ্রনাথের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তাঁর ‘নতুনদা’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ, প্রিয় ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ও হিতেন্দ্রনাথ, স্ত্রী মৃণালিনী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ।

Write up on haunted houses by Parijat Bandyopadhyay on Rabibasariya -  Anandabazar
ওরা থাকে ওপারে

সেদিন রোজকার মতোই প্রেতচর্চায় বসেছেন সকলে। আচমকাই ঠাকুরবাড়ির একজন জানতে চাইলেন, কাকে আনা হয়েছে। নাম জানতেই তিনি সেই মৃতের উদ্দেশে গালাগালি দিয়েছিলেন। ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গেল অঘটন! টেবিলটা মিডিয়ামকে দূরে ছিটকে ফেলে দেয়। সটান উঠে আসে তাঁর গলার কাছে। অনেক অনুনয় করে শেষপর্যন্ত শান্ত করা গিয়েছিল সেই আত্মাকে। কিন্তু বন্ধ হয়ে যায় চর্চা। যদিও বাড়ির বাইরে বাড়ির সদস্যরা প্ল্যানচেট চর্চা চালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই পুরনো কলকাতায় গ্যাসলাইটের আলোর আলো-আঁধারিতে এমন সব কাহিনি ইতিহাসের সঙ্গে মিলেমিশে আজও কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে। যা বাঙালির প্রেতচর্চা ও তার নেপথ্যে থাকা জীবন-জিজ্ঞাসাকেই প্রতিফলিত করে চলে।

Source: Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language