তিনি দেশবাসীকে স্মরণ করিয়েছিলেন সেই সব নারীর যন্ত্রণার কথা, যারা ভোরের আলো ফোটার আগে বা সূর্যাস্তের পর অন্ধকার নেমে আসার অপেক্ষায় থাকত, যাতে শৌচালয়ের অভাবে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য তাদের লোকচক্ষুর আড়ালে যেতে না হয়। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন সেইসব শিশুর শূন্য, নিষ্প্রভ বৃষ্টির কথা-যেখানে ফুটে উঠত খিদের ব্যাথা, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে যাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রোগে জর্জরিত। কলমে এম জে আকবর
স্বাধীন ভারতের ভবিষাৎ যাত্রা সূচিত হয় ১৯৪৭ সালে। সেই সময় ৩৫ কোটি মানুষের মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করতেন। পরিসংখ্যানে এক নির্মম, শীতল সূচক ধরা পড়ে। যেমন, গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩২ বছর। প্রসূতিমৃত্যু ঘটত আকছার। স্বাক্ষরতার হার মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ।
২০১৩-‘১৪ সালে সেই দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের অনুপাত কমে দাঁড়ায় ২৯.১৭ শতাংশে। এর অর্থ, তখনও ৩০ কোটিরও বেশি ভারতীয় দারিদ্রের মধ্যে জীবন কাটাত। দৃষ্টিভঙ্গি একটু পরিবর্তন করে দেখুন। মানুষের জীবনযাত্রার ন্যূনতম স্তরে নিঃসন্দেহে ব্যাপক উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও নিছক সংখ্যার বিচারে ২০১৪ সালেও চরম দারিদ্রে নিমজ্জিত ভারতীয়র সংখ্যা ১৯৪৭ সালের তুলনায় তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি।

ভারতের প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই দারিদ্রমোচনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ২০১৪ সালে লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদির প্রথম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে তিনি দারিদ্র-নির্মূলের যে তীব্র প্রত্যয় প্রকাশ করেছিলেন, তা এককথায় অভূতপূর্ব। ছিল ভারতের বিবেকের কাছে এক শক্তিশালী আহ্বান- দারিদ্রের অভিশাপকে আমাদের ভাগ্যের অনিবার্য পরিণতি হিসাবে মেনে না নিয়ে তা মুছে ফেলার ডাক। তিনি দেশবাসীকে স্মরণ করিয়েছিলেন সেই সব নারীর যন্ত্রণার কথা, যারা ভোরের আলো ফোটার আগে বা সুর্যাস্তের পর অন্ধকার নেমে আসার অপেক্ষায় থাকত, যাতে শৌচালয়ের অভাবে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য তাদের লোকচক্ষুর আড়ালে যেতে না হয়। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন সেইসব শিশুর শূন্য, নিষ্প্রভ বৃষ্টির কথা-যেখানে ফুটে উঠত খিদের ব্যাথা, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে যাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রোগে জর্জরিত।
২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট, লালকেল্লা থেকে উচ্চারিত, সেই শক্তিশালী বক্তব্যের উৎস ছিল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বেদনা। ২০১৪ সালে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, ২০১৫ সালে সেগুলির উত্তর দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। বিরোধী দলের কিছু নেতা তখন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে সরব হন, যখন ব্যাঙ্ক-যা এত দিন মূলত অর্থসম্পন্ন মানুষের নাগালের মধেই সীমাবদ্ধ ছিল-সাধারণ মানুষের জন্যও উন্মুক্ত করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ‘শূন্য ব্যালান্স’ (zaro balance) ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার ধারণা নিয়েও তাঁরা বিস্তর হাসাহাসি করেন। অথচ পরে এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৫০ কোটিতে পৌঁছয় এবং সরাসরি সরকারি সুবিধা হস্তান্তরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই ব্যবস্থার প্রধান সুবিধাভোগীদের হয়ে ওঠে নারীরা, কারণ পারিবারিক কল্যাণ ও পরিবারের সামগ্রিক স্বার্থরক্ষায় নারীরা অধিকতর কার্যকর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে। দেশজুড়ে শৌচাগার নির্মাণের এক ব্যাপক অভিযান নারীদের জীবনে মর্যাদা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আধার এবং মোবাইল প্রযুক্তি-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে গৃহীত নীতিগুলির বিস্তৃত পরিসর দ্রুত পরিবর্তনের এক দীর্ঘ দলিল ‘কোভিড ১৯’ সংকটও এক অর্থে নতুন সুযোগের জন্ম দিয়েছিল। বর্তমানে গম, চাল ও ডাল ৮০ কোটিরও বেশি। ভারতীয়ের খাদ্যনিরাপত্তার একটি মৌলিক ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এর ফলে এই কর্মসুচি ইতিহাসের বৃহত্তম কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির অন্যতম হিসাবে পরিগণিত হয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন নিঃসন্দেহে মোদি জমানার একটি বিশেষ সাফল্যের মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রযুক্তিকে মধ্যবিত্তের আওতা থেকে বের করে এনে সমাজের সর্বস্তরে সর্বজনীন করে তোলার এই প্রয়াস অভূতপূর্ব তো বটেই। পাশাপাশি, প্রযুক্তিকে শুধুমাত্র বিনোদনের হাতিয়ার করে না রেখে তাকে জ্ঞান-শিক্ষা ও তথ্যের প্রয়োজনে নিয়োজিত করাও প্রশংসার দাবি রাখে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক বিকাশের পর্যায়, বা বিশ্বের অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় আমাদের প্রবৃদ্ধির হার যে সর্বোচ্চ এই পরিসংখ্যানগত তথ্যের ভিত্তিতেই যে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে এমন দাবি করা নিতান্তই অবিবেচনাপ্রসূত। তবে এটুকু বলাই যায়, ১৯৪৭-৫০ সালে যে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই হতাশা ও নিষ্ক্রিয়তা ও উৎকণ্ঠার কিছুটা হলেও নিরাময় সম্ভব হয়েছে, আংশিক সাফল্যও মিলেছে। নতুন প্রজন্ম আরও অনেক কিছু উন্নতির প্রত্যাশী, তাদের সে দাবি ন্যায্য। কিন্তু দারিদ্রের প্রায় সম্পূর্ণ অবসান- বিশ্ব ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী যা এখন শতাংশেরও নীচে- আমাদের এই অধিকার দিয়েছে যে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সূচনা শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা-স্বপ্ন দেখা শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণির।
