Hashtagintro

শাসক যত কৌশলী, বিরোধী ততই ছন্নছাড়া! উপনির্বাচনে বিজেপির জয়ে বিস্ময়ের কিছু নেই

উপনির্বাচনে ২টি আসনেই মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি মুসলিমদের ভোট চেয়ে ‘বন্ধুত্ব’-র হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, ‘আপনারা উন্নয়নের সঙ্গে থাকুন, সরকারের সঙ্গে থাকুন। ৬ অক্টোবর হোক বন্ধুত্ব দিবস।’ তিনি এও বলেন, ‘ভেদাভেদের রাজনীতি আর নয়, উন্নয়ন সবার জন্য।’ তাঁর সেই আহ্বানে সংখ্যালঘুরা সাড়া দিয়েছে বলে জেতার পর দাবি করেছেন শুভেন্দু। 

উপনির্বাচনে রাজ্যের ২টি আসনে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির বিশাল জয় অবাক করা কোনও ঘটনা নয়। এটাই হওয়ার ছিল। নন্দীগ্রাম মুখ‌্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গড়, সেখানে বিজেপি ব‌্যবধান বাড়ানোর লড়াইয়ে নেমেছিল। সে-কথা মুখ্যমন্ত্রী বলেওছিলেন। আর রেজিনগর যে এই বাজারে বিরোধীদের ধরে রাখা কঠিন, সংখ‌্যালঘুরাও তাদের প্রতি ভরসা রাখতে পারবে না, সেটা রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ফলে বিরোধীরা যতই ‘লুট’-এর অভিযোগ করুক, বাস্তবে তাদের বুথ রক্ষায় ব‌্যর্থতাই প্রকট।

নির্বাচন মানে যুদ্ধ। গোলাপ ফুল বিনিময়ের গল্প নয়। এখানে কেউ কাউকে জায়গা ছাড়ে না। বাংলায় গেরুয়া শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর বিরোধী দলগুলির শোচনীয় দশা হয়েছে। কংগ্রেস ও সিপিএমের অবস্থার কোনও উন্নতি ভোটের ফলে দেখা যায়নি। তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থা আবার ভোটের পর বেশি খারাপ হয়েছে। ২০৮টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি। তৃণমূলের ভাঙনে বিধানসভায় শাসক দলের পরোক্ষ শক্তি এখন ২৭০।

ক্ষমতা হারাতেই তৃণমূলের হাতে থাকা সব কর্পোরেশন, পুরসভা, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদে গণ পদত‌্যাগ শুরু হওয়ায় সেগুলি হয় ভেঙে গিয়েছে, নয়তো হাতছাড়া হয়েছে। এরপর অটো-টোটো, বস্তি-সমবায়-ইউনিয়ন মায় পুজো কমিটির রংও গেরুয়া হওয়াটা স্বাভাবিক।

বিজয়ী ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৩-৬৪ জন কালীঘাটের ছায়া থেকে বেরিয়ে ‘ভালো তৃণমূল’ হয়েছেন। তাঁরা আদতে শাসকের পন্থী, না কি কালীঘাটের বিরোধী, তা নিয়েই এখন জোর চর্চা। রাজ্যের ৪২ লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপির হাতে ছিল মাত্র ১২টি। এখন সেটাও পরোক্ষভাবে ৩২। ২০ জন সাংসদ নামগোত্রহীন একটি দলে যোগ দিয়ে এনডিএর সবচেয়ে বড় শরিক হয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ভোট চেয়ে দিল্লিতে বিজেপি শিবিরে এখন অবাধ মেলামেশা করছেন। রাজ‌্যসভায় বিজেপির ছিল তিন সাংসদ। এখন বেড়ে ৭। ৪ জন তৃণমূল সাংসদ ইস্তফা দিয়ে বিজেপির টিকিটে জিতে এসেছেন। ভাঙন নিচুতলায়ও। ক্ষমতা হারাতেই তৃণমূলের হাতে থাকা সব কর্পোরেশন, পুরসভা, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদে গণ পদত‌্যাগ শুরু হওয়ায় সেগুলি হয় ভেঙে গিয়েছে, নয়তো হাতছাড়া হয়েছে। এরপর অটো-টোটো, বস্তি-সমবায়-ইউনিয়ন মায় পুজো কমিটির রংও গেরুয়া হওয়াটা স্বাভাবিক। ফলে, ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েও গদি হারাতেই তিন টুকরো তৃণমূল কংগ্রেস। লোকসভায় একটি দল, বিধানসভায় একটি, নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায়ের নেতৃত্বাধীন আর একটি দল। কোনটা অাসল তৃণমূল সেই দ্বন্দ্ব এতটাই প্রকট হয়েছে যে নির্বাচন কমিশন দলের নাম ও প্রতীক এই উপনির্বাচনের প্রেক্ষিতে সাময়িক ফ্রিজ করে দেয়। আটকে দেওয়া হয় দলের কয়েকটি অ্যাকাউন্টও।

ভোটে হার-জিত থাকেই। কিন্তু এভাবে তাসের ঘরের মতো গোটা দলটা ভেঙে পড়বে সত্যিই ভাবা যায়নি। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে, ক্ষমতার মধু খেতে দলনেত্রীকে মৌমাছির মতো ঘিরে থাকতেন যাঁরা, তাঁরাই সময় খারাপ বুঝে কেটে পড়েছেন। আসলে তাঁদের কাছে ‘দিদি’ কোনও আদর্শ ছিলেন না, ছিল উদ্দেশ্য। ক্ষমতার লাড্ডু খাওয়ার সেতু। রাজনীতি এখন কোন পাঁকে ডুবেছে সেটা ভালো করেই দেখিয়ে দিলেন এসব নেতা। তৃণমূলের এই দশা দেখে অন‌্য রাজনৈতিক দলগুলি কতটা শিক্ষা নেবে জানি না, তবে পলিটিক‌্যাল সায়েন্সের ছাত্রদের এই অধ‌্যায় পড়তে হবেই। দলত্যাগ বিরোধী বোকা বোকা আইনটিকে ছুড়ে ফেলে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে।

ভোটে হার-জিত থাকেই। কিন্তু এভাবে তাসের ঘরের মতো গোটা দলটা ভেঙে পড়বে সত্যিই ভাবা যায়নি। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে, ক্ষমতার মধু খেতে দলনেত্রীকে মৌমাছির মতো ঘিরে থাকতেন যাঁরা, তাঁরাই সময় খারাপ বুঝে কেটে পড়েছেন।

প্রধান বিরোধীর এমন করুণ দশার পর উপনির্বাচনে যে বিজেপি হইহই করে জিতবে তা নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। এমনকী, ৭২ শতাংশ সংখ‌্যালঘু থাকা সত্ত্বেও রেজিনগরও যে ছত্রখান বিরোধীরা ধরে রাখতে পারবে না সেটাও বোঝা গিয়েছিল। এটা ঠিক, ভোটের দিন বেশ কিছু ভিডিও সামনে এসেছে যাতে দেখা যাচ্ছে ভোটার বলছেন, তাঁদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। তবে এমন চিত্র নতুন কিছু নয়। ভোটের দিন অভিযোগ-পালটা অভিযোগ থাকেই। কিন্তু প্রতিরোধও গণতন্ত্রে একটি অংশ। দুই আসনে বিরোধীদের দিক থেকে সে সব যে কিছুই ছিল না, তার প্রমাণ হল একটিও অশান্তি রক্তপাত মারামারির খবর সামনে না আসা। ভোট হয়েছে শান্তিতেই। একটি বোমা পড়েনি। গুলি চলেনি। পড়েনি লাশ।

পশ্চিমবঙ্গে উপনির্বাচন মানে শাসক দলের জয়, এটাই চেনা ছবি। কিন্তু ভরা বাম অামলেও দেখেছি উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামের মতো আসন বামফ্রন্টের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল বিরোধী দল। এখন উপনির্বাচন মানে বিরোধী দলের অস্তিত্বের সংকট। তৃণমূল অামলে গত দেড়-দুই বছরের মধ্যে ১০টি আসনে উপনির্বাচন হয়েছিল। বলা বাহুল‌্য, ১০টিই বিরাট ব‌্যবধানে জিতেছিল তৎকালীন শাসক। বিরোধীদের আসনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এটাই উপনির্বাচনের ট্রেন্ড। একতরফা শাসকের দিকেই রায় যায় বাংলায়। এ-যাবৎ কালের একটি উপনির্বাচনের কথা বলি, যে ফল সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দিনহাটা আসনে উদয়ন গুহকে মাত্র ৫৭ ভোটে হারিয়েছিলেন বিজেপির নিশীথ প্রামাণিক। তিনি সাংসদ পদ রেখে আসন ছেড়ে দেওয়ায় কিছু দিনের মধ্যে উপনির্বাচন হয়। হেরে যাওয়া উদয়ন গুহ মাত্র কয়েক মাসের মধে‌্য জিতেছিলেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ভোটে। ৪৬ শতাংশ ভোট কোন জাদুবলে পৌঁছয় ৮৪ শতাংশে! এবার রাজ্যের যে ২টি অাসনে উপনির্বাচন ছিল তার ফিচারটা অদ্ভুত! নন্দীগ্রামে সংখ‌্যাগুরু ও সংখ‌্যালঘু ভোটের অনুপাত ছিল ৭০-৩০ শতাংশ। রেজিনগরে আবার ৭২ শতাংশ সংখ‌্যালঘু ভোট। বাকিটা হিন্দু ভোট। যদি মেরুকরণের অঙ্ক কষি তাহলে স্পষ্ট নন্দীগ্রাম পাবে বিজেপি, রেজিনগর অ-বিজেপি কেউ। কিন্তু ২টি অাসনই বিজেপির পক্ষে গেল কেন?

প্রতিরোধও গণতন্ত্রে একটি অংশ। দুই আসনে বিরোধীদের দিক থেকে সে সব যে কিছুই ছিল না, তার প্রমাণ হল একটিও অশান্তি রক্তপাত মারামারির খবর সামনে না আসা।

বিরোধীরা বলতে পারেন, তাঁদের এজেন্ট বসতে দেওয়া হয়নি। ভোটই দিতে পারেনি মানুষ। তাঁদের দিক থেকে এমন অভিযোগ একটি অজুহাতের অংশ। প্রচারে খুব তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন মুখ‌্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২টি কেন্দ্রেই তিনি গিয়েছিলেন। কত ব‌্যবধানে ২টি অাসন জিতবেন, তারও একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সরাসরি হিন্দুত্বের পক্ষে ভোট চেয়েছিল। সেই কৌশল এতটাই একমুখী ছিল যে কোনও অাসনেই তারা একজনও মুসলিম প্রার্থী দঁাড় করায়নি। কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে দেখা গেল উপনির্বাচনে ২টি আসনেই মুখ‌্যমন্ত্রী সরাসরি মুসলিমদের ভোট চেয়ে ‘বন্ধুত্ব’-র হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, ‘অাপনারা উন্নয়নের সঙ্গে থাকুন, সরকারের সঙ্গে থাকুন। ৬ অক্টোবর হোক বন্ধুত্ব দিবস।’ তিনি এও বলেন, ‘ভেদাভেদের রাজনীতি অার নয়, উন্নয়ন সবার জন‌্য।’ তঁার সেই অাহ্বানে সংখ‌্যালঘুরা সাড়া দিয়েছে বলে জেতার পর দাবি করেছেন শুভেন্দু। আরও বলেছেন, ২টি কেন্দ্রেই ৩০ হাজারের বেশি সংখ‌্যালঘু মহিলা ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ পাওয়ার জন‌্য সপরিবার বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।

এটা গেল বিজেপির যুক্তি, বিরোধী শিবিরের চেহারাটা আদৌ ভোটে জেতার মতো ছিল কি না এবার সেটা দেখা যাক। নন্দীগ্রামে প্রধান বিরোধী দল তৃণমূলের কোনও স্থানীয় নেতা প্রার্থী হতে চাননি। যঁাকে রাজি করানো হল তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মনোনয়নই প্রত‌্যাহার করে নেন। রেজিনগরের প্রার্থীও সেই পথে হঁাটবেন বলেও দলের চাপে শেষ পর্যন্ত থেকে যান। কিন্ত প্রচারে প্রায় ছিলেনই না। এভাবে ভোট জেতা যায়? ২টি আসনে বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৫ জন করে বিরোধী প্রার্থী ছিলেন। নন্দীগ্রামে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, আইএসএফ এবং গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন। রেজিনগরে আবার এই দলগুলি ছাড়াও ছিল তৃণমূল ও হুমায়ুন কবীরের প্রার্থী। একজন বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৫-৬ জন করে বিরোধী প্রার্থী। বলুন, মানুষ কাকে বেছে নেবে? কেন ভোট দিতে পথে নামবে?

সংখ‌্যালঘুদেরও মনে হতে পারে, এই যদি বিরোধীদের দশা হয়, তাহলে খামোকা সরকারের বিরুদ্ধে যাব কেন? স্বাভাবিকভাবেই তাই দুই আসনে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এই ভোট থেকে কোন দল কী অবস্থায় দাঁড়িয়ে, সেই চিত্রও পাওয়া গেল। নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান পেয়েছেন প্রায় ৪২ হাজার ভোট। মাত্র ৫ মাস আগে কংগ্রেস যে আসনে সাড়ে ৭০০ ভোট পেয়েছিল, সেখানে ৪১ হাজার বেশি ভোটের কারণ যে মমতার সমর্থন, সেটা স্পষ্ট। দুই, রেজিনগরে দ্বিতীয় হয়েছেন হুমায়ুনের ছেলে। বাকিদের জামানত গিয়েছে। সিপিএম তথা বামফ্রন্ট ২টি আসনেই শোচনীয় ফল করেছে। আরও শোচনীয় অবস্থা কালীঘাট থেকে বেরিয়ে অাসা বিধায়কদের দল গণতান্ত্রিক তৃণমূলের। সবার শেষে নোটা-র সঙ্গে তাদের লড়াই। এই হল উপনির্বাচনের নির্যাস। শাসক যত কৌশলী, বিরোধী ততই ছন্নছাড়া। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। যা হওয়ার নয়, তা হয়নি।

Source: Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language