পর্যটক হিসাবে প্যারিস ও অ্যানেসির বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরা ও অসংখ্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম অক্টোবরের অস্থির ফ্রান্সে। জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন, সামাজিক পরিবর্তন ও রাজনীতিবিদদের প্রতি অনাস্থা নিয়ে প্রতিবাদের অধিকার মানুষের অবশ্যই রয়েছে। তবে সেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে অন্য মানুষ, দেশীয় স্থাপত্য-ভাস্কর্য-সহ ঐতিহাসিক শহরটির ক্ষতি করার অধিকার কারও আছে কি? লিখছেন দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত।
ফ্রান্সে এসে মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম– অর্থনৈতিক কষ্ট, অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ এবং সরকারের প্রতি হতাশা, সব একসঙ্গে কাজ করছে।
আমি প্যারিসের প্রতিটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নই। সংবাদে দেখা বা পড়া সব ঘটনাকে নিজের চোখে দেখেছি বলারও প্রশ্ন নেই। কিন্তু এখানে এসে মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা আমাকে বিষয়টি অন্যভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে। হোটেলের কর্মী, ট্যাক্সিচালক, ক্যাফের লোকজন, দোকানদার, মিউজিয়ামের কর্মী এবং রাস্তায় দেখা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ স্পষ্ট ইংরেজিতে, কেউ ভাঙা ইংরেজিতে নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। সবার মত এক নয়। তবু তঁাদের কথা শুনে ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আমার মনে তৈরি হয়েছে। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের খবরও সেই প্রশ্নগুলিকে আরও জোরালো করেছে।
অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ায় বাড়িভাড়া, খাবারদাবার, দৈনন্দিন খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এগুলো প্রশ্নাতীতভাবে বাস্তব সমস্যা। এবং এই নিয়ে সাধারণ ফরাসিদের ক্ষোভ থাকা বা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্বর তোলা স্বাভাবিক। সে অধিকারও তঁাদের থাকা উচিত, বলা বাহুল্য। প্রশ্ন হল, সেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে অন্য মানুষের ক্ষতি করার অধিকার কারও আছে কি?
কলকাতায় থাকাকালীন সংবাদপত্রে যেসব ভাঙচুরের খবর পড়েছিলাম, পরে নিজের চোখে
তার চিহ্ন দেখে বুঝলাম, খবরগুলি নিছক ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের ‘রিল’ নয়। প্লাস দা লা রেপিওবলিকে-তে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের যে বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, তার গায়ে দাগ লাগানো, কালি ও রং দিয়ে লেখা এবং বিকৃত করার ঘটনা সত্যিই ঘটেছে। ১৯ অক্টোবরের সকালে দেখলাম, কর্মীরা উঁচুতে উঠে স্মৃতিস্তম্ভটি পরিষ্কার করছেন। ট্যাক্সিতে বসে নিজের চোখে বহু জায়গায় পরিষ্কারের কাজ চলতে দেখেছি। কোথাও কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের কাজও চলছিল। শহরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য রক্ষা করার জন্য কর্মীদের এই পরিশ্রম দেখে মনে হয়েছে, ভাঙচুর করতে কয়েক মুহূর্ত লাগে, কিন্তু সেই ক্ষতি মুছতে কত মানুষের সময় ও শ্রম ব্যয় হয়! প্যারিসের সৌন্দর্য শুধু আইফেল টাওয়ার বা তার বিখ্যাত স্থাপত্যে নয়, তার রাস্তার ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ এবং পুরনো শহরটিকে যত্ন করে বঁাচিয়ে রাখার মধ্যেও রয়েছে। ভাস্কর্যগুলোর জন্যই প্রতিটি মোড় এখানে অসাধারণ!
আর্ক দ্য ত্রিয়োঁফের আশপাশে এবং লঁু্যভ মিউজিয়ামের গেটের কাছে নিরাপত্তার জন্য বিপুল পুলিশ মোতায়েন দেখেছি। প্যান্থিয়নের সামনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ চলতে দেখেছি। সেখানে ছবি তুলতে গিয়ে মাত্র একটি ছবি তুলতে পেরেছিলাম। কয়েকজন প্রতিবাদকারী আমাকে আর ছবি তুলতে দেননি। কেন তঁারা এমন করলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানি না। হয়তো তঁারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, হয়তো আন্দোলনের ছবি অন্য
কোনও উদ্দেশ্যে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। তঁাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান
করতে চাই না। তবে ঘটনাটি আমাকে ভাবিয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অধিকার, কিন্তু সেই প্রতিবাদের পরিবেশে সাধারণ মানুষের চলাফেরা ও ছবি তোলার স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
অ্যানেসি ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে, সুইজারল্যান্ডের কাছাকাছি অবস্থিত একটি ছবির মতো সুন্দর শহর।
একটি বিষয় আমার কাছে পরিষ্কার। কোনও ক্ষোভই ঐতিহাসিক ভাস্কর্য নষ্ট করা, দোকান ভাঙা বা অন্য মানুষের জীবিকা ধ্বংস করার যুক্তি হতে পারে না। যে কোনও ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মৌলবাদ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ক্ষতি করে। তাই ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদেরও মনে রাখতে হবে, কোনও উগ্রবাদী গোষ্ঠী যেন সাধারণ মানুষের ন্যায্য ক্ষোভকে ব্যবহার করে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে না পারে। সরকারের বিরুদ্ধে রাগ থাকলে সরকারের নীতির বিরোধিতা করুন, মিছিল করুন, বক্তব্য রাখুন। কিন্তু একটি শহরের ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ নষ্ট করে কী লাভ?
ছোট দোকানদারের দোকান ভাঙলে তার সংসার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দোকানের কর্মচারী কাজ হারাতে পারে। সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হলে তার মেরামতির খরচও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকেই আসে। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে যদি শ্রমিকের কর্মসংস্থানই নষ্ট হয়, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যদি ছোট ব্যবসায়ীর জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে সেই আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
অভিবাসন নিয়েও ফ্রান্সের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কয়েকজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। প্রায় বিশ বছর ধরে তঁারা ফ্রান্সে। তঁাদের কয়েকজনও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিরক্ত। বক্তব্য, সরকার যুদ্ধ ও সামরিক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, অথচ সাধারণ মানুষের উন্নয়ন, জীবনযাত্রার খরচ এবং সামাজিক পরিষেবায় আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অ্যানেসি ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে, সুইজারল্যান্ডের কাছাকাছি অবস্থিত একটি ছবির মতো সুন্দর শহর। স্বচ্ছ নীল হ্রদ, পাহাড়, খাল, পুরনো শহরের রঙিন বাড়ি আর মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের জন্য শহরটি বিখ্যাত। এখানে বয়স্ক মানুষদের অনেককেই বেশ শান্ত, নিশ্চিন্ত জীবন কাটাতে দেখেছি। কিন্তু তঁাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝেছি, এই শান্ত জীবনের আড়ালেও ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে কারও কারও উদ্বেগ রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন, সামাজিক পরিবর্তন ও রাজনীতিবিদদের প্রতি অনাস্থা নিয়ে তঁাদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। বাইরে থেকে অ্যানেসি যত শান্ত ও নিরুদ্বেগ মনে হয়, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু মানুষের মনের মধ্যে ততটাই প্রশ্ন জমে আছে। কিছু বয়স্ক ফরাসি সুপার সিনিয়র সিটিজেনদেরমনে হচ্ছে, তঁাদের পরিচিত ফ্রান্স অনেক বদলে গিয়েছে। অভিবাসনের মাত্রা এবং দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে তঁারা উদ্বিগ্ন।
ধর্মীয় মৌলবাদের প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স জিহাদি সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে।
আবার রেস্তোরঁায় বসে কয়েকজন মহিলার সঙ্গে কথায় উঠে এসেছে রাজনীতিবিদদের প্রতি অবিশ্বাস। তঁাদের বক্তব্য, ভোটের সময় নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, মানুষের ভয় ও উদ্বেগকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু পরে সমস্যাগুলির সমাধান
হয় না।
এসবই আমার সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত মতামত। ফরাসি সমাজের মত বলে এগুলোকে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অভিবাসনই ফ্রান্সের সব সমস্যার কারণ, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না। তবে মানুষের উদ্বেগকে অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সরকারকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, অভিবাসন এবং সামাজিক সংহতি নিয়ে স্পষ্ট নীতি নিতে হবে।
অ্যানেসিতে পর্যটন কার্যকলাপ বন্ধ থাকতে দেখেছি। ২৪ অক্টোবর, যখন এই লেখা লিখছি, স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে দুপুরেই ধর্মঘট ও বড় জমায়েতের আশঙ্কার কথা শুনেছি। তবে সব কার্যকলাপ বন্ধ থাকার কারণ যে বিক্ষোভই, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তঁারা। পর্যটক হিসাবে এটুকু বুঝেছি, অস্থিরতার প্রভাব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। হোটেল, রেস্তোরঁা, বাসচালক, গাইড এবং পর্যটনের উপর নির্ভরশীল বহু মানুষের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ধর্মীয় মৌলবাদের প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স জিহাদি সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ২০১৫ সালের ‘শার্লি এবদো’ হামলা এবং প্যারিসের নভেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা তারই প্রমাণ। ইসলামিক মৌলবাদী সংগঠনগুলির যে অংশ সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় বিদ্বেষ, সহিংসতা বা অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার পথে চলে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অপরাধের প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলিকে নিষিদ্ধ করা, তাদের অর্থের জোগান বন্ধ করা এবং সহিংস কার্যকলাপের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই ফ্রান্সের বিক্ষোভকারীদেরও মনে রাখতে হবে, যে কোনও ধর্মের নামে মৌলবাদ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি করে।
এখানে উগ্র বামপন্থা, উগ্র দক্ষিণপন্থা, বা ধর্মীয় উগ্রবাদ, কোনওটিকেই ছাড় দেওয়া যায় না।
অর্থনৈতিক অসন্তোষের আন্দোলনের মধ্যে কোনও উগ্রবাদী গোষ্ঠী যদি ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ায় বা সহিংসতাকে উসকে দেয়, তার বিরোধিতা করা আন্দোলনকারীদেরও দায়িত্ব। তবে ইসলামিক মৌলবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মুসলমান এক নয়। ফ্রান্সে বহু মুসলমান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, পরিবার নিয়ে বাস করছে এবং সমাজের অংশ হয়ে উঠেছে। তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য সন্দেহ করা বা দোষারোপ করা অন্যায়। একই নীতি অবশ্য অন্য সব ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ধর্মের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ধর্মের নামে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অধিকার থাকবে না।
এখানে উগ্র বামপন্থা, উগ্র দক্ষিণপন্থা, বা ধর্মীয় উগ্রবাদ, কোনওটিকেই ছাড় দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হলেও যে গোষ্ঠী সহিংসতার মাধ্যমে অন্যের অধিকার নষ্ট করে, তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। তবে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করার আগে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকা জরুরি। এই পরিস্থিতিতে কার্ল পপারের ‘দ্য ওপেন সোসাইটি অ্যান্ড ইটজ এনিমিজ’ (১৯৪৫) বইটির কথা এখানে মনে পড়ে। একটি মুক্ত সমাজকে নিজের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয়। সহিষ্ণুতা মানে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার সামনে আত্মসমর্পণ করা নয়।
সরকারকে ফ্রান্সের মানুষের ক্ষোভের কারণগুলি বুঝতে হবে। সরকারকে জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অভিবাসন নিয়ে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং লুটপাট, আগুন ও আক্রমণের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
daktarbabu2020@gmail.com