ইনিশিয়াল পাবলিক অফার (আইপিও, মানে প্রাইমারি মার্কেটে শেয়ার ইস্যু) (IPO) নিয়ে কলকাতার খুচরো বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ বাড়ছে। সাম্প্রতিক ট্রেন্ডের ভিত্তিতে রিটেল ইনভেস্টরদের আগ্রহ নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন সংশ্লিষ্ট নানা মহল।
বেশ কিছু কাল ধরেই কলকাতার ইক্যুইটি বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশকে ধৈর্য্যশীল আর মূলত ব্লু চিপ শেয়ার-নির্ভর বলে মনে করা হয়। নিয়মিত ডিভিডেন্ড পেতে চান তাঁরা, আর পোস্টাল সেভিংস স্কিম জাতীয় তুলনামূলক রক্ষণশীল লগ্নিই তাঁদের পছন্দ, এমনই বলা হয়।
কিন্তু গত বারো মাসের তথ্য দেখলে বোঝা যায় সাবেকি ছবিতে কিছু অদলবদল এসেছে। আইপিও’তে খুচরো বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয় ব্রোকাররা। লায়ন্স রেঞ্জ এবং ডালহৌসির আশেপাশে থাকা বিভিন্ন ব্রোকারেজ সংস্থার মতে, প্রথম দিনের ভাল লিস্টিংয়ের সম্ভবনা, দ্রুত T+3 সেটলমেন্ট এবং প্রযুক্তির সাহায্যে আবেদন করার সুযোগ নতুন বিনিয়োগকারীদের আইপিও বাজারে টানছে। প্রথম বার আইপিও’তে অ্যাপ্লিকেশন করছেন, এমন খুচরো বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। বাজারের মধ্যস্থতাকারীদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক কয়েকটি পাবলিক ইস্যুতে ভাল লিস্টিংয়ের ফলে তাঁদের খুচরো গ্রাহকদের অংশগ্রহণ বেশ ভাল বেড়েছে। এর ফলে কিছুটা হলেও প্রচলিত ব্যাঙ্ক আমানত থেকে অর্থ প্রাইমারি মার্কেটের দিকে যাচ্ছে।
কলকাতার ভাটিয়া সিকিউরিটিজের প্রোপ্রাইটর বিকাশ ভাটিয়া বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে এই শহরে আমাদের সক্রিয় খুচরো গ্রাহকদের মাত্র ৮-১০ শতাংশ প্রাথমিক ইস্যুতে আবেদন করতেন। বিষয়টি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (মানে ইনস্টিটিউশানাল ইনভেস্টরদের) প্রায় একচেটিয়া ক্ষেত্র হিসেবেই দেখা হত। এখন রিটেলের সংখ্যা চার গুণ হয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক কয়েকটি কোয়ার্টারে ভাল লিস্টিং গেনস সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে আইপিও তাঁদের পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনার একটি উপায় হতে পারে।’’
বিকাশবাবুর মতে, আইপিও মার্কেটে প্রবেশের প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তঁার কথায়, দ্রুত ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খোলা এবং পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ে ASBA (Application Supported by Blocked Amount) বা UPI-র মাধ্যমে টাকা ব্লক করার সুযোগ থাকায়, কোনও ইস্যু ঘোষণা হওয়ার পরেই বিনিয়োগকারী সেখানে আবেদন করতে পারেন। সামনে বড়-মাপের পাবলিক ইস্যু থাকায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে। ইস্যুর সাবস্ক্রিপশন শুরু হওয়ার সময় যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়, সেই কারণে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খোলার প্রবণতাও বেড়েছে বলে তিনি জানান।
ব্রোকাররা একই সঙ্গে আইপিওর জন্য শেয়ারহোল্ডার কোটার কথাও গ্রাহকদের জানাচ্ছেন। ভারতীয় মূলধনী বাজারের কাঠামোয় কোনও বড় কর্পোরেট গোষ্ঠী তাদের কোনও বড় সহযোগী সংস্থাকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করলে, অনেক সময় ইস্যুর একটি নির্দিষ্ট অংশ ওই মূল সংস্থার বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ শৈবাল নন্দীও মনে করেন, বিনিয়োগের স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর কথায়, “কিছু দিন আগে পর্যন্ত প্রাইমারি মার্কেটে আমার লগ্নি খুবই কম ছিল। তার কারণ নতুন শেয়ারের অ্যালটমেন্ট পাওয়া অনেকটা লটারির মতো মনে হত। মূল সংস্থার শেয়ারহোল্ডার কোটার বিষয়টি জানার পরে আমার ইনভেস্টমেন্টের পদ্ধতিই বদলে যায়। পরিকল্পিত সহযোগী সংস্থার তালিকাভুক্তির অনেক আগেই ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রেখেছি এবং রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো মূল সংস্থার শেয়ার ধরে রেখেছি। রিটেল এবং ইনস্টিটিউশানাল, এই দুই কোটায় আবেদন করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীর আইপিও পাওয়ার সুযোগ থাকে।”
চলতি NSE’র বৃহৎ আইপিও এবং আগামী দিনে জিও’র আইপিও ঘিরে প্রত্যাশার মধ্যে প্রাথমিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আপাতত জোরালো। কলকাতার ব্রোকারদের ধারণা, খুচরো অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে।
বিকাশবাবুর বক্তব্য, পাবলিক ইস্যুতে সুযোগ পেতে হলে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা জরুরি। বিশেষ করে অতিরিক্ত সাবস্ক্রিপশনের বাজারে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খোলা এবং প্রয়োজনীয় মূল সংস্থার শেয়ার আগে থেকে ধরে রাখার বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
