ভারতীয় ক্রিকেটে শেষ হল অজিত আগরকর-অধ্যায়। জাতীয় নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৪ অক্টোবর। তার তিন দিনের মধ্যেই টিম ইন্ডিয়ার হেডকোচ গৌতম গম্ভীরের (Gautam Gambhir) মুখে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বুলি! যা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। ব্যাপারটা কী?
গম্ভীর লিখেছেন, ‘ইতিহাস আপনার প্রতি আরও সদয় হবে।’ গম্ভীরের এই একটি বাক্যই অনেক বেশি অর্থবহ। আগরকরের সময়ে একের পর এক সাফল্য এলেও তাঁকে নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। সেই কারণেই কি ভবিষ্যতে তাঁর কাজকে অন্য ভাবে মূল্যায়ন করবে ক্রিকেটমহল? গম্ভীরের মন্তব্যের পর সেই প্রশ্নই উঠেছে। আগরকরকে ‘অজিত ভাই’ বলে সম্বোধন করে গম্ভীর লিখেছেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করা ছিল সম্মানের। তাঁর নেতৃত্বে তিনটি আইসিসি ট্রফি জয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। দলের স্বার্থ এবং দলকে এগিয়ে রাখাই যে ছিল আগরকরের মূল নীতি, সেকথাও পরিষ্কার করে দিয়েছেন তিনি। শেষে আগরকরের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন গম্ভীর। তারপরেই তাঁর মন্তব্য, ‘ইতিহাস আপনার প্রতি আরও সদয় হবে।’
Dear Ajit Bhai, an absolute honour to work with you. Those 3 ICC trophies are testimony of your conviction: Team first & Team ahead, always.. I must say, History will be kinder to you. Thank you for everything. My heartfelt wishes for your future endeavours !! https://t.co/gYQN0fea8X
— Gautam Gambhir (@GautamGambhir) October 7, 2026
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে শেষ সাংবাদিক সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত সমালোচনা নিয়ে কথা বলেছিলেন। সেই সময় তীব্র সমালোচনার মুখেও তিনি বলেছিলেন, “সংবাদমাধ্যম আমার প্রতি যতটা নির্দয় ছিল, ইতিহাস আমার প্রতি তার থেকেও বেশি সদয় থাকবে।” তাঁর প্রয়াণের পর ১২ আগের সেই মন্তব্যই আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে গম্ভীরের মন্তব্যে।
কিন্তু কেন এই মন্তব্য? উত্তর খুঁজতে ফিরে তাকাতে হয় আগরকরের তিন বছরের বেশি সময়ের নির্বাচক-জীবনের দিকে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন আগরকর। তাঁর সময়ে ভারত ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। পাশাপাশি ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপেও রানার্স হয়েছিল ভারত। এশিয়া কাপ এবং এশিয়ান গেমসেও এসেছে সাফল্য। ফলে ফলাফলের বিচারে আগরকর যথেষ্ট সফল। তবে সাফল্যের পাশেই ছিল বিতর্ক। বিশেষ করে রোহিত শর্মা এবং বিরাট কোহলির টেস্ট অবসর এবং পরবর্তী দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। রোহিতের ওয়ানডে ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছিল জল্পনা। বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, ধীরে ধীরে হিটম্যানকে নাকি ওয়ানডে দল থেকে সরিয়ে দেওয়ার ভাবনা ছিল। একই সঙ্গে যশস্বী জয়সওয়ালকে ওপেনিংয়ে আরও সুযোগ দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন বলেও জল্পনা রয়েছে।
সমস্যার সূত্রপাত ইংল্যান্ড সিরিজের আগেই। আগরকর চেয়েছিলেন, ওয়ানডে দলে রোহিত শর্মাকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগোতে। নির্বাচকমণ্ডলীর বাকি সদস্যেরাও সেই সিদ্ধান্তে সম্মত ছিলেন বলে জানা যায়। রোহিতকে সিদ্ধান্তের কথা জানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রজ্ঞান ওঝাকে। তবে বিশ্বকাপ খেলার ব্যাপারে প্রবল আগ্রহী রোহিত নির্বাচকদের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। পরে বোর্ডের এক কর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিজের অসন্তোষের কথা জানান। এর পরেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বোর্ড সচিব সাইকিয়া রোহিতের পক্ষ নিয়ে মন্তব্য করেন। লর্ডস ম্যাচের আগে রোহিতের অবসরের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেন তিনি। এমনকী তিনি বিশ্বকাপ খেলবেন বলেই জানান তিনি। সেই মন্তব্যে আগরকর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলে খবর।
এই আবহেই গম্ভীরের বিদায়ীবার্তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি অবশ্য সরাসরি কোনও বিতর্কের কথা বলেননি। বরং সাফল্যকে সামনে রেখে মনে করিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচকদের কাজের মূল্যায়ন সব সময় তাৎক্ষণিক ভাবে হয় না। নেটপাড়ায় আলোচনা চলছে, ক্রিকেটে নির্বাচকদের ভূমিকার এই জায়গাটাই সবচেয়ে কঠিন। দল সাফল্য পেলে কৃতিত্বের বড় অংশ যায় ক্রিকেটারদের কাছে। কিন্তু দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই প্রথম কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় নির্বাচকদের। আগরকরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যাই হোক, বিসিসিআইও আগরকরকে ‘সার্টিফিকেট’ দিয়েছে। বোর্ডের বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আপনার মেয়াদকালে ভারত তিনটি আইসিসি ট্রফি, দু’টি এশিয়া কাপ এবং পরপর দু’টি এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালেও উঠেছে ভারত। জাতীয় নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে আপনার দায়িত্ববোধ, অবদানের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আগামী দিনের জন্য রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা।’
