স্বাতী চট্টোপাধ্যায় ভৌমিক: একান্নবর্তী পরিবার বললেই মা দুর্গার কথা মনে হয়, আবার বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই একান্নবর্তী পরিবারের বছরকার বাড়ি ফেরা। তবে আর একটু ভেতরে ঢুকলে বেশিরভাগ বনেদি বাড়ির অন্দরমহলে লুকিয়ে থাকে লোভ, লালসা, চাপা ক্ষোভ, কলঙ্ক এবং পাপ। সাহানা দত্তর কাহিনিতে সুমন দাস পরিচালিত হইচইয়ে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দেবীপক্ষ’ সিরিজে অভিনয় করেছেন ঊষশী রায়, অপরাজিতা আঢ্য, বিমল চক্রবর্তী, সুস্মিত মুখোপাধ্যায়, অনন্যা সেন, অভিজিৎ সরকার, ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাড়ির মেয়েদের জিভের ওপর লাগাম দেওয়া যে বাড়ির ছেলেদের কর্তব্য ছিল, সেখানে খোদ বাড়ির কর্তার জিভ টেনে ছিঁড়ে নেওয়ার সাহস কার হল?
শীলবাড়ির কালীপ্রতিমার সোনার জিভ চুরি গিয়েছে। স্বপ্নাদেশে পাওয়া সেই জিভ ছাড়া আজও মায়ের পুজো হয় না। প্রত্যেকবার প্রতিমা বিসর্জনের আগে সেই জিভ খুলে নেওয়া হয়। কিন্তু এ বছর দুর্গাপুজোর আগে প্রতিমার গয়না বার করার সময় জানা যায় সেই জিভ উধাও। সকলের ধারণা বাড়ির ডিভোর্সি বড় বউমা ঈশানীই সেই জিভ চুরি করেছে। ঈশানী নিজে সে কথা স্বীকার না করলেও পুজোয় হাজিরা দিতে অমত করেনি। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন খুন হয়ে গেলেন বাড়ির কর্তা। বাড়ির মেয়েদের জিভের ওপর লাগাম দেওয়া যে বাড়ির ছেলেদের কর্তব্য ছিল, সেখানে খোদ বাড়ির কর্তার জিভ টেনে ছিঁড়ে নেওয়ার সাহস কার হল?
রহস্য অনেক, চিত্রনাট্য টান টান। ধোঁয়াশাও অনন্ত। কিছুতেই ধরা যায় না খুনি কে? চুরিটাই বা কার কীর্তি? গল্প বলার দক্ষতায় দর্শকের সন্দেহ ঘুরতে থাকে একে একে বাড়ির প্রায় সব সদস্যের দিকে।

সাহানার অন্যান্য অনেক গল্পের মতোই এখানেও লৌকিক-অলৌকিক, গা ছমছমে, মায়াবী কিছু ব্যাপার আছে। পরিচালক সেই সমস্ত ছায়াময় রহস্যকে সার্থকভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। বাড়ির কর্তার মাঝরাতে পাশের বাড়ি যাওয়া, ছোটকর্তার অজানা কারণে বেরিয়ে যাওয়া, বড়ছেলের বিয়ে ভাঙা, সব মিলিয়ে কালীসাধক বংশের প্রায় সমস্ত পুরুষই এখানে ভ্রষ্ট চরিত্রের। আর সব জেনেও মুখে কুলুপ এঁটে থাকে বাড়ির বউ-মেয়েরা। এমন নয় যে তারা সব অনাচার মেনে নেয়। তবু যেন বংশমর্যাদার সঙ্গে সঙ্গে ওটুকুও প্রাপ্য। রহস্য অনেক, চিত্রনাট্য টান টান। ধোঁয়াশাও অনন্ত। কিছুতেই ধরা যায় না খুনি কে? চুরিটাই বা কার কীর্তি? গল্প বলার দক্ষতায় দর্শকের সন্দেহ ঘুরতে থাকে একে একে বাড়ির প্রায় সব সদস্যের দিকে। তবু এই সিরিজের সবচেয়ে খারাপ লাগার জায়গা গল্প শেষ হয় না। ইদানীং সিরিজের গল্প টেনে রেখে আগামী সিজনে টেনে নিয়ে যাওয়ার চল হয়েছে। কিন্তু সেই সব ক্ষেত্রে অন্তত কিছুটা রহস্যের জট খুলে দেওয়া কাম্য। না হলে দর্শক কোন আশায় আট এপিসোডের জন্য সময় দেবে? ঝুম্পার পরিচয় যেখানে দর্শক বুঝেই গিয়েছে, সেখানে অন্তত তার কারণ বা ইতিহাসটুকু জানানো যেতে পারত। চুরি ও খুনের রহস্য পরবর্তী সিজনের জন্য তুলে রাখা যেত। কিন্তু চিত্রনাট্যের এই অজানা কারণে দর্শককে হতাশ করা বেশ বিরক্তি জাগায়। একটা ভালো থ্রিলারের অপমৃত্যু ঘটে বললেও অত্যুক্তি হয় না। আগামী সিজন কবে আসবে জানা নেই, ততদিনে দর্শক গল্প ভুলেও যেতে পারেন।
অভিনয়ে সকলেই বেশ ভালো। আলাদা করে উল্লেখ্য উষসী রায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ। অপরাজিতা আঢ্যর অভিনয় দেখলে বোঝা যায় এই ধরনের চরিত্র তাঁর চেনা মাঠ, এগিয়ে এসে একের পর এক সিক্সার হাঁকিয়েছেন তিনি। অসম্ভব ভালো তাঁর সমস্ত অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার ধরন এবং নৈঃশব্দ্যও। বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন বড়কর্তার চরিত্রে বিমল চক্রবর্তী এবং ছোটকর্তার ভূমিকায় অভিজিৎ সরকার। প্রত্যশামতোই ঝুম্পার চরিত্রে অনন্যা সেন দুর্দান্তভাবে মানিয়ে গিয়েছেন। গল্পের প্লট, রহস্য, চিত্রগ্রহণ, আবহ, অভিনয় সবকিছু মন ভারালেও শেষটুকুর জন্য আপসোস থেকে যাবে।
