Hashtagintro

একই সংসারের দুই বোন, রয়েছেন দুই পাড়ায়! নলহাটির সিংহবাহিনী ও দশভুজার আরাধনার কথা জানেন?

একই গ্রামের দুই প্রান্তে দুই দেবীর অধিষ্ঠান। একজন মা সিংহবাহিনী, অন্যজন দশভুজা। পুজোর আয়োজন আলাদা, দুই পরিবারের পরিচয়ও ভিন্ন। তবু বাউটিয়ার মানুষের বিশ্বাসে তাঁরা একই পরিবারের দুই বোন। আধুনিক পুজোর থিম, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা কিংবা জাঁকজমকের প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে বংশপরম্পরায় চলে আসা প্রাচীন রীতিনীতি এবং পারিবারিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে বীরভূমের নলহাটি থানার বাউটিয়া গ্রামের এই দুই দুর্গাপুজো। প্রায় ৫০০ মিটারের ব্যবধানে দুই পাড়ায় দেবীর আরাধনা ঘিরে প্রতি বছরই তৈরি হয় উৎসবের আবহ। তবে এই পুজোর আসল আকর্ষণ শুধু প্রাচীনত্বে নয়, দুই পরিবারের পুজোকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক বিশেষ আত্মিক বন্ধনে।

গ্রামের এক প্রান্তে চ্যাটার্জি পরিবারের মা সিংহবাহিনী, অন্য প্রান্তে ওঝা পরিবারের আরাধ্যা দশভুজা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই দুই পুজো বাউটিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুই পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যেও উঠে আসে সেই বিশ্বাসের কথা—সিংহবাহিনী ও দশভুজা যেন পরস্পরের পরিপূরক দুই বোন। তাই পুজো আলাদা হলেও আবেগের বন্ধনে তাঁদের আলাদা করে দেখেন না গ্রামের বহু মানুষ। বাউটিয়ার এই দুই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে প্রাচীন বিধি মেনে চলার প্রবণতা। যেমন চ্যাটার্জি পরিবারের সিংহবাহিনী পুজোয় বেলুড় মঠের পঞ্জিকা অনুসরণ করা হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে দেবীর আরাধনা। সপ্তমীতে দেবীকে নিবেদন করা হয় অন্নভোগ। ভাতের সঙ্গে থাকে বিভিন্ন ধরনের শাকভাজা, সবজি ও মিষ্টান্ন। অন্যদিকে অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে ফল, মিষ্টি, লুচি, সুজি এবং পায়েস নিবেদনের রীতি রয়েছে। 

মা দশভুজা।

পুজোর দিনগুলিতে শুধু মন্ত্রোচ্চারণ বা দেবীবন্দনাই নয়, প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পরিবারের পুরনো রীতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন সদস্যরা। সময় বদলেছে, বদলেছে উৎসব পালনের ধরনও। কিন্তু বাউটিয়ার এই দুই পরিবারে পুজোর ঐতিহ্য ধরে রাখার আন্তরিকতা আজও অটুট। দেবীর আরাধনায় ধর্মীয় বিধির পাশাপাশি রয়েছে প্রাচীন লোকাচারের ছাপ। নিয়ম মেনে আখ, চালকুমড়ো ও পাঁঠা বলির প্রথাও পালিত হয়। বিজয়া দশমীতে সিঁদুরখেলা ও দেবীবরণের পর আসে বিদায়ের পালা। আনন্দের উৎসব শেষ হওয়ার মুহূর্তে বিষাদের আবহে দেবীকে বিদায় জানান পরিবারের সদস্যরা। পরের বছরের অপেক্ষা শুরু হয় সেখান থেকেই।

মা সিংহবাহিনী।

ওঝা পরিবারের সদস্য প্রমোদ কুমার ওঝার কথায়, তাঁদের পরিবারের দশভূজা পুজোর সূচনা হয় ৯১৪ বঙ্গাব্দে। পূর্বপুরুষরা স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজো শুরু করেছিলেন বলে তাঁদের পারিবারিক বিশ্বাস। সেই সময় থেকে যে রীতিনীতি চলে আসছে, আজও তা মেনে দেবীর আরাধনা করা হয়। প্রমোদ কুমার ওঝা জানান, তাঁদের পরিবারের এক পূর্বপুরুষ পূর্ব বাংলা (বর্তমান-বাংলাদেশ) থেকে এসে মা সিংহবাহিনীর পুজো প্রচলন করেছিলেন। তবে জনবল ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে দুই দেবীর পুজোয় একই ধরনের রীতিনীতি অনুসরণ করার চল শুরু হয় বলে তাঁদের পরিবারের প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। সেই সূত্রেই দুই পুজোর মধ্যে আচার-অনুষ্ঠানের মিল এবং দুই দেবীকে দুই বোন হিসেবে দেখার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করেন পরিবারের সদস্যরা।

অন্যদিকে চ্যাটার্জি পরিবারের সদস্য সৌমিক চ্যাটার্জির কথায়, মা সিংহবাহিনী কয়েকশো বছর ধরে পূজিত হয়ে আসছেন। বেলুড় মঠের পঞ্জিকা অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয় পুজোর যাবতীয় আচার। তাঁর কথাতেও উঠে এসেছে দুই দেবীকে দুই বোন হিসেবে দেখার সেই লোকবিশ্বাস। আজকের দুর্গাপুজোয় প্রতিযোগিতার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে থিম, মণ্ডপসজ্জা ও আলোর বাহার। কিন্তু বাউটিয়ার চ্যাটার্জি ও ওঝা পরিবার সেই চেনা প্রতিযোগিতার বাইরে নিজেদের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রেখেছে। এখানে পুজোর মাহাত্ম্য বিচার হয় না মণ্ডপের আড়ম্বর দিয়ে; বরং প্রাধান্য পায় পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া রীতি, পারিবারিক বিশ্বাস এবং গ্রামের মানুষের সম্মিলিত আবেগ।

Source: Sangbad Pratidin Bengal & Politics (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Bengal & Politics (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language