দার্জিলিংয়ের মাথায় ‘টাইম বোমা’- র মতো হিমবাহ-হ্রদ নেই। এটাই স্বস্তি! তবে ভূতাত্ত্বিকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে এখানকার নবীন ও অস্থিতিশীল হিমালয় পর্বতমালা। পাশাপাশি ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন সিক্স-এ অবস্থান। গত এক দশকে এই অঞ্চলে চারশোর বেশি ভূমিকম্প হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এটা বড় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত হতে পারে।
চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূ-গবেষক মধুসূদন কর্মকার বলেন, “দার্জিলিং পাহাড়ে প্রতি বছর গড়ে ২৩টি ভূমিকম্প হয়। প্রায় প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ বছর অন্তর ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটে।”
জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী, দার্জিলিংকে অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি এবং ইউনাইটেড স্টেট জিওলজিকাল সার্ভের গবেষণা সূত্রে জানা গিয়েছে, গত এক দশকে দার্জিলিং-কালিম্পং পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় চারশোর বেশি ভূমিকম্প হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে, বছরে গড়ে ৪৩ এবং মাসে ৩ বার এখানকার মাটি কেঁপেছে। বেশিরভাগ ভূমিকম্প রিখটার স্কেলে মাত্রা ৪-এর কম থাকায় তেমন গুরুত্ব পায়নি। তবে ভূমিকম্প ভূমিধসের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শৈল শহরের বিপদ বাড়ছে। গবেষকদের মতে, প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ বছরের ব্যবধানে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কবলে পড়ছে দার্জিলিং পাহাড়। তাই শঙ্কা থেকেই গিয়েছে এটা বড় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত হতে পারে। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। দার্জিলিং পাহাড়েও যে সেটা হতে পারে তেমন ইঙ্গিত মিলেছে ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের (বিআইএস) সমীক্ষায়। সংস্থা দেশের নতুন আপডেট সিসমিক জোনেশন ম্যাপে দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং সিকিমের সমস্ত জেলা-সহ পুরো হিমালয় অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন সিক্স-এ রেখেছে। অর্থাৎ এখানে রিখটার স্কেলে ৮ থেকে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূ-গবেষকরা জানিয়েছেন, দার্জিলিং পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় ভূমিকম্প অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, হিমালয় ও তার পাদদেশ ইন্ডিয়ান প্লেটের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক বিপরীতে আছে ইউরেশিয়ান প্লেট। প্রতি বছর ইন্ডিয়ান প্লেট পাঁচ সেন্টিমিটার করে উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেটকে ঠেলছে৷ এই ধাক্কার ফলে মাটির নীচে তীব্র এনার্জি তৈরি হচ্ছে৷ সেটা বাইরে বেরনোর সময় ভূমিকম্প হচ্ছে।
চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূ-গবেষক মধুসূদন কর্মকার বলেন, “দার্জিলিং পাহাড়ে প্রতি বছর গড়ে ২৩টি ভূমিকম্প হয়। প্রায় প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ বছর অন্তর ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটে।” তিনি জানান, ভূমিকম্প ভূমিধসের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শৈল শহরের বিপদ বেড়েছে। কেন এমন বিপদের সম্ভাবনা বেড়ে চলেছে? গবেষকদের মতে, দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্শিয়াংয়ের মতো শহরগুলিতে পাহাড়ের ঢালু জমিতে অপরিকল্পিত কংক্রিটের বহুতল নির্মাণ করা চলছে। দার্জিলিং শহরের চকবাজারে দাঁড়ালে এখন পাহাড় দেখা যায় না। বেশিরভাগ বহুতলই ভূমিকম্প নিরোধক নিয়ম অর্থাৎ সিসমিক কোড মেনে তৈরি নয়। রাস্তা চওড়া করার জন্য লাগাতার যেভাবে ভারী মেশিন দিয়ে পাহাড় কাটা, রেল অথবা সড়কপথের জন্য টানেল তৈরি করা চলছে, তা আরও বিপদ ডেকে আনছে বলেই মত।
শুধু তাই নয়, তিস্তা নদীতে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ নির্মাণের ফলে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব অর্থাৎ বেসাল সাপোর্ট ক্রমশ কমছে। ‘গোদের উপর বিষফোড়া’ হয়েছে উন্নয়নের নামে পাহাড় জুড়ে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈজ্ঞানিকভাবে নির্মাণ, নদীমুখ ও বক্ষ আটকে দেওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে এসবই বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়িয়ে চলেছে। বিপদ এড়াতে গবেষকদের পরামর্শ, এখন থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, পাহাড় বাঁচিয়ে উন্নয়ন ও সবুজায়নের উপর জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে ভূমিকম্পের ‘হটস্পট’ এলাকা চিহ্নিত করতে জাপানের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা। ভূ-গবেষকরা জানিয়েছেন, দার্জিলিং পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় ভূমিকম্প অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, হিমালয় ও তার পাদদেশ ইন্ডিয়ান প্লেটের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক বিপরীতে আছে ইউরেশিয়ান প্লেট। প্রতি বছর ইন্ডিয়ান প্লেট পাঁচ সেন্টিমিটার করে উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেটকে ঠেলছে৷ এই ধাক্কার ফলে মাটির নীচে তীব্র এনার্জি তৈরি হচ্ছে৷ সেটা বাইরে বেরনোর সময় ভূমিকম্প হচ্ছে।
অন্যদিকে, হিমালয় মূলত দু’ধরনের ভূতাত্ত্বিক সামগ্রী দিয়ে তৈরি। একটি ডালিং সিরিজ ও অন্যটি দামুদা সিরিজ। ডালিং সিরিজ নবীন, ভঙ্গুর পাথর দিয়ে তৈরি। দামুদা সিরিজে পুরনো স্থায়ী পাথর, বেলে ও চুনামাটি থাকে। দার্জিলিং হিমালয় ডালিং সিরিজের অন্তর্ভুক্ত। নবীন হওয়ার কারণে সেটি এখনও স্থায়ী হয়নি। নিজের আকার ধীরে ধীরে পরিবর্তন করছে। ওই কারণে দার্জিলিং হিমালয়ে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। কিন্তু সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন সিক্স-এ চলে যাওয়ায় এখানে বিপদ বেড়েছে। আগামীতে রিখটার স্কেলে ৮ থেকে ১০ মাত্রায় ভূমিকম্প হতে পারে। সেটা হলে অপরিকল্পিত নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালে নেপালের ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি হতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
