৬০ বছরের ওপর রাজনৈতিক জীবন। আড়াই দশক বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান। রাজ্য সম্পাদক হিসেবে পার্টির দায়িত্ব সামলেছেন এক দশক। বাংলার রাজনীতিতে রাজনৈতিক সন্ন্যাসী বলেই পরিচিত। সেই বিমান বসুকে নিয়ে বই প্রকাশের পাশাপাশি তথ্যচিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিল সিপিএম। বুধবার ‘আমাদের চেয়ারম্যান’ শীর্ষক বইটি প্রকাশ করা হয়। আর তথ্যচিত্রটি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে।
দীর্ঘ কয়েক দশক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন। এখন পার্টির কোনও পদে না থেকেও অলিখিত সর্বেসর্বা। প্রবীণ সিপিএম নেতা বিমানকে নিয়ে বুধবার ‘আমাদের চেয়ারম্যান’ শীর্ষক বইপ্রকাশ হয় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। বইটি সম্পাদনা করেছেন সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত। বইপ্রকাশের দিনই আরও দু’টি প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়। সুদীপ বলেন, “বিমানদার একটি আত্মজীবনীমূলক বই তৈরির প্রস্তুতি চলছে। নির্মিত হচ্ছে একটি তথ্যচিত্রও। সেটি নির্মাণ করছেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।”
কমলেশ্বরের সিপিএম-ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত। সেই তাঁকেই বিমানের ছ’দশকের রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস তথ্যচিত্র আকারে ধরে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে বিক্ষিপ্তভাবে বিমান বসু বেশ কিছু দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাতে তাঁর রাজনীতিতে আসা, দলের সর্বক্ষণের কর্মী হওয়ার যাত্রা থেকে শুরু করে কমিউনে দিন কাটানোর ইতিহাস বলেছেন। কিন্তু সে সবই বিক্ষিপ্ত। বিমানের গোটা জীবনকে একটি মলাটে ধরে রাখতে চাইছে সিপিএম। এটাই তার গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে অভিমত সিপিএম নেতৃত্বের।
ছয়ের দশকের ছাত্র-যুব আন্দোলন থেকে যে ‘সপ্তরথী’কে সিপিএমের নেতৃত্বে তুলে এনেছিলেন প্রয়াত প্রমোদ দাশগুপ্ত, তাঁদের মধ্যে বিমানই এখনও জীবিত রয়েছেন। বাকিদের কেউ বহু দিন আগে, কেউ সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। সেই তালিকায় রয়েছেন অনিল বিশ্বাস, সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, দীনেশ মজুমদার এবং শঙ্কর গুপ্ত। বিমানের বয়স এখন ৮৬ বছর। সম্প্রতি তিনি অসুস্থও হয়েছিলেন। তবে সিপিএম নেতৃত্ব জানান, বিমানের বিপুল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ধরে রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে তা করা হবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে অনেক সময় নেওয়া হবে না, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন কমরেডকুলের নেতারা।
আজীবন সংগঠনেই থেকে গিয়েছেন বিমান। সংসদীয় ‘মোহ’ তাঁকে ছুঁতে পারেনি। অথচ প্রস্তাব ছিল তাঁর কাছে। ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিমানকেই বাঁকুড়া লোকসভা থেকে দাঁড়াতে বলেছিলেন তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে ‘পিডিজি’-কে বিমান জানান, তিনি সংসদীয় রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত হবেন না। সংগঠনের কাজ করবেন। সেই পর্বে রাজি হয়েছিলেন প্রমোদ। তবে বিমানকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিকল্প প্রার্থী খুঁজে দেওয়ার। তা খুঁজতে গিয়েই বিমান যাঁকে আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি রাজ্য তো বটেই সর্বভারতীয় স্তরের সংসদীয় রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য নাম-বাসুদেব আচারিয়া। ছাত্র আন্দোলনের পরে বিমানের মূল কাজের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। সেখানে দিনের পর দিন তাকার কারণেই সাঁওতালি নানা পদ তাঁর মুখে রুচে গিয়েছিল। আবার রাজনৈতিক জীবনে নানা সময়ে বিতর্কেও জড়িয়েছেন। ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবন। বনেদি বাড়ি ছেড়ে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। বর্ণময় বিমান এবার তথ্যচিত্রে।
