কলকাতা পুরসভায় আসন পুনর্বিন্যাস ও মহিলা সংরক্ষণ নিয়েও নিয়ম ভাঙার অভিযোগে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন বিরোধীরা। কার্যত একই সুরে একই তথ্য পৃথকভাবে তুলে ধরে সংবিধানের নানা ধারা লঙ্ঘিত হচ্ছে অভিযোগ তুলে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন প্রদেশ কংগ্রেস, সিপিআইএম এবং কালীঘাট তৃণমূল।
তিন পক্ষই ইতিমধ্যে একাধিকবার পুরসভার প্রশাসক তথা কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেকে অভিযোগগুলি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, নতুন ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসে সীমানা নিয়ে একাধিক মারাত্মক আপত্তি জানিয়ে ‘স্পট ভিজিট’ ও নাগরিকদের মতামত জানতে এলাকায় গিয়ে জনশুনানির প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা প্রশাসকের কাছে গুরুত্ব পায়নি। মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে সংসদে পাস হওয়া নগরপালিকা আইনের কোনও নিয়ম মানছে না বর্তমান কলকাতা পুরসভা ও রাজ্যের নগরোন্নয়ন দপ্তর। কিন্তু পুরসভার তরফে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করছেন বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব। কারণ, সমস্ত প্রকাশিত তালিকায় খসড়া বলে দাবি করছে পুরসভার প্রশাসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসাররা। তাই চূড়ান্ত তালিকা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করলেই হাই কোর্টে মামলা করবে বলে বাম, কংগ্রেস ও মমতা-তৃণমূলের নেতৃত্ব জানিয়েছে।
নভেম্বরের শেষে ২৮ অথবা ২৯ তারিখ কলকাতা পুরসভার ২০৯টি ওয়ার্ডে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে রাজ্য সরকার। ইতিমধ্যে শাসক বিজেপি নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণে পৃথকভাবে নানা মণ্ডল কমিটি নিয়ে বৈঠক শুরু করে দিয়েছেন। দুই জেলা সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ ও অনুপম ভট্টাচার্য বিভিন্ন মন্ডল থেকে জমা পড়া দলীয় প্রার্থী হতে ইচ্ছুকদের নামের তালিকা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের নেতৃত্বে থাকা নির্বাচনী কমিটিকে জমা দিয়েছেন।
সূত্রের খবর, বিদায়ী পুরবোর্ডের বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি শাসকদলের হয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে নামতে চাইছেন। একই ভাবে বাম ও মমতা-তৃণমূলও বিধানসভা ভিত্তিক প্রার্থীতালিকা নিয়ে বৈঠক শুরু করেছেন। সোমবারও দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারীতে বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের অফিসে নির্বাচনী প্রস্তুতির বৈঠক করেছে মমতা-তৃণমূল। পিছিয়ে নেই বামেরা। জ্ঞানেশ কুমারের ইস্যু নিয়ে পথে নামার পাশাপাশি নবীন প্রজন্মকে এবার বিভিন্ন ওয়ার্ডে বেশি করে প্রার্থী করতে চাইছে আলিমুদ্দিনের নেতৃত্ব।
উপনির্বাচন পর্ব শেষ করেই প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের নেতৃত্বে কোমর বেঁধে মাঠে নামছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। কিন্তু এরই মধ্যে একই সঙ্গে বাম, কংগ্রেস ও মমতা-তৃণমূল, তিন পক্ষই আবার আসন পুনর্বিন্যাস ও সংরক্ষণ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছে। বিষয়টি নিয়ে দলীয় আইনজীবীরা খসড়া সম্পূর্ণ করেছেন।
কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অভিযোগ করেছেন, “এসআইআর করে বিজেপি যেমন রাজ্যের দখল নিয়েছে, ঠিক সেই পথে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবার কর্পোরেশনের দখল নিতে চাইছে গেরুয়া শিবির।” গত পাঁচমাসে কলকাতা পুরসভার পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করে প্রদেশ সভাপতি বলেন, “একই সঙ্গে জনগণনা ও ডিলিমিটেশন দুটোই হচ্ছে। পুরানো ১৪৪টি ওয়ার্ডকে ভাঙা হচ্ছে কীসের ভিত্তিতে, কেউ জানে না। মহিলা সংরক্ষণের বেলাতেও ফের তাই হল, নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একই ওয়ার্ড পর পর চারবার মহিলা করা হচ্ছে।”
মমতা-তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তথা প্রাক্তন মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ডিলিমিটেশন নিয়ে ড্রাফট কে করল, কারা করল, কেউ কিছুই জানে না। সংবিধান মেনে সব কিছুর একটা পদ্ধতি আছে। প্রাক্তন কাউন্সিলর, বিধায়ক ও সমস্ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিয়ম মেনে কথা বলা দরকার। কিন্তু পুরপ্রশাসক কারও কথা শুনছেন না।” সিপিএমের জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার বলেন, “নিয়ম মেনে জনসংখ্যার পরিবর্তে স্রেফ ভোটার তালিকাকে প্রধান ভিত্তি বানিয়ে যেভাবে ওয়ার্ডের পুনর্বিন্যাস হচ্ছে, তাতে কলকাতার প্রকৃত জনবিন্যাসের ছবি কোনওভাবেই স্পষ্ট হবে না।”
