‘বিকেলে ফিরে পুজোর কেনাকাটা করতে যাব’— ছেলের শেষ বলা কথাগুলো আজও বারবার কানে বাজে মায়ের। কিন্তু ছেলে আর ফেরেনি।
এক রক্তাক্ত বিকেলে দাড়িভিট হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্র তাপস বর্মনের বুক গুলিতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়। দেখতে দেখতে পার আট-আটটি বছর। ফি বছর শরৎ আসে। ঢাকের কাঠিতে সুর ওঠে। আনন্দস্রোতে ভাসে চারপাশ। কিন্তু পুত্রশোকের তীব্র যন্ত্রণায় বিদ্ধ মা মঞ্জুদেবীর দেবীদর্শন আর হয় না। বিচার না পাওয়ার বুকচাপা ক্ষোভ ও অভিমান বাড়ে। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর শহর থেকে প্রায় নয় কিমি দূরে দাড়িভিটের এক জীর্ণ টিনের চালায় ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।

২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। দাড়িভিট হাইস্কুলে বাংলা ভাষার শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। আচমকা গুলি ও বোমার গর্জনে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। মাত্র এক বছর আগে ওই স্কুল থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ইসলামপুর কলেজে ভর্তি হয়েছিল দুই বন্ধু তাপস বর্মণ ও রাজেশ সরকার। মাতৃভাষার শিক্ষকের দাবিতে সহপাঠীদের আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দু’জনেই। কিন্তু সেই আন্দোলনই কেড়ে নেয় তাঁদের প্রাণ।
আট বছর ধরে প্রশাসনের দরবারে কড়া নেড়েও মেলেনি বিচার। ফলে উৎসবের মরসুম এলেই ক্ষোভে-যন্ত্রণায় ফুঁসে ওঠেন দুই মা মঞ্জু বর্মন ও ঝর্ণা সরকার। মঞ্জুদেবী রুদ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন তোলেন, ‘এতগুলো বছর গড়িয়ে গেল, আমার নিষ্পাপ ছেলের মৃত্যুর বিচার আজও পেলাম না কেন?’ ঠাকুরঘরে শিব-পার্বতীর মূর্তির পাশে রাখা ছেলে তাপসের বাঁধানো ছবির দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠেন মা।
কয়েক বছর আগের পুজোর স্মৃতি মনে পড়তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মঞ্জুদেবী। শোকার্ত মা বলেন, ‘তাপসকে ছাড়া কোনওদিন ঠাকুর দেখতে যাইনি।’ সেই তাপস আজ চিরঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরের মেঝেতে মাথা কুটে মা প্রশ্ন করেন, ‘যার সন্তানই নেই, সে কোন মুখে পুজো দেখতে বেরোবে?’

কিছুটা দূরে রাজেশদের জীর্ণ বাড়ি। বাবা নীলকান্ত সরকার দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। মা ঝরনাদেবী বিষণ্ণ সুরে বলেন, ‘দুর্গাপুজোর এই সময়টাই আমাদের ছেলের রক্তে ভেজা মাস। আমাদের আর কিসের উৎসব, কিসের পুজো!’ একটু থেমে ফের বলেন, “ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল আমাদের। সব শেষ। তবু ছেলের স্মৃতিই আমাদের সম্বল। ছেলের স্মৃতিতেই বাঁচি।”
উৎসবে আলোর রোশনাই আর ঢাকের বোলে মুখরিত হবে গোটা বাংলা (Durga Puja 2026)। কেবল দাড়িভিটের এই দুটি নিঃস্ব পরিবার আঁকড়ে থাকে শোক আর অন্তহীন আঁধার।
