২০১৭-তে জিএসটি সূচনার মাধ্যমে পরোক্ষ কর ব্যবস্থার জন্য অভিন্ন একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করা হয়। ‘পরবর্তী প্রজন্মের জিএসটি’ (Next-Gen GST) সেই উদ্যোগকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে গত ৯ বছরের করদাতা ও রাজ্যগুলোর অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হয়েছে। লিখছে, নির্মলা সীতারমন।
‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তোলার যে লক্ষ্য ভারত ধার্য করেছে, তা অর্জনের জন্য এমন একটি অর্থনীতির প্রয়োজন যেখানে ছোট-বড় সব ধরনের উদ্যোগ বিকশিত হতে পারে। গত ১২ বছর ধরে আমাদের সরকার সেই অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করে চলেছে। ২০১৭ সালে জিএসটি সূচনার মাধ্যমে পরোক্ষ কর ব্যবস্থার জন্য অভিন্ন একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করা হয়। ‘পরবর্তী প্রজন্মের জিএসটি’ (Next-Gen GST) সেই উদ্যোগকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে গত ৯ বছরের করদাতা ও রাজ্যগুলোর অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী চিন্তাধারার আলোকে মূলত ২টি উদ্দেশ্য নিয়ে ‘পরবর্তী প্রজন্মের জিএসটি’-র পরিকল্পনা করা হয়। এগুলি হল: করের হার কমানো ও কর-সংক্রান্ত নিয়মকানুন মেনে চলার প্রক্রিয়াকে সহজতর করা। করের হারের এই পরিবর্তনগুলি ২০২৫ এর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রক্রিয়াগত সংস্কারের পরবর্তী পর্যায়টি শীঘ্রই জিএসটি পরিষদের বিবেচনার জন্য পেশ করা হবে। সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগগুলির লক্ষ্য হল: পরিবারিক স্তরে সকলকে স্বস্তি দেওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও নিশ্চয়তা বজায় রাখা এবং করদাতাদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে তঁারা কোনও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ছাড়াই নিজেদের কর-সংক্রান্ত দায়িত্বগুলি পালন করতে পারেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজ্যগুলি আমাদের অংশীদার হিসাবে পাশে থেকেছে। পরিষদে তারা নিজেদের অগ্রাধিকার ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছে এবং সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। এই নিষ্ঠা ও অঙ্গীকারের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। প্রতিটি সরকারের নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে অভিন্ন এক জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের এই ইচ্ছার উপরই জিএসটির এই এগিয়ে চলা ও সাফল্য নির্ভর করছে।
এই ফলাফলগুলি আস্থার ভিত্তি জোগায়। ২০২৫-এর অক্টোবর থেকে ২০২৬-এর জুলাইয়ের মধ্যে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঘোষিত করযোগ্য সরবরাহের মূল্য ২৫.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। করের হার সহজ করার পাশাপাশি ঘোষিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। এটি এমন এক সংস্কারের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি, যার লক্ষ্য হল ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থব্যবস্থা– উভয় বিষয়কেই সহায়তা করা। রাজস্ব সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এগিয়ে চলার এই লক্ষণগুলি স্পষ্ট।
রাজ্যগুলির রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থাপণাও এখন বেশ শক্তিশালী। এই বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে, আইজিএসটি নিষ্পত্তির ভাগ-সহ তাদের মোট এসজিএসটি আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে পণ্য পরিষেবা কর বা জিএসটি সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২.৪৬ লক্ষ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৬% বেশি। জুন থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে প্রতি মাসেই বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল দুই অঙ্কের ঘরে। এই চার মাসে রাজস্ব সংগ্রহের গতি প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থ ফেরত দেওয়ার পর নিট সংগ্রহের পরিমাণও এই ছয় মাসে ১০.৪% বেড়েছে। করদাতাদের স্বস্তি এবং উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের বৃদ্ধিও হয়েছে। সম্প্রসারণের পরিমাণের পাশাপাশি এর বিস্তৃতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১১টি ক্ষেত্র এবং প্রধান প্রধান রাজ্যগুলির সবক’টিতেই ঘোষিত করযোগ্য সরবরাহের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ভারতের মতো বৈচিত্রময় অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই বিস্তৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও অঞ্চলে এই উন্নয়ন আরও বেশি সংখ্যক ব্যবসাকে সম্প্রসারিত বাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়; পাশাপাশি, এর ফলে সৃষ্ট চাহিদা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুফল আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে।
সংস্কার-পরবর্তী তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপভোক্তাদের কাছে সরাসরি বিক্রির পরিমাণও বেড়েছে ২৬.৭%। করের বোঝা কমার সুফল যখন পণ্যসামগ্রীর দামে প্রতিফলিত হয়, তখন পরিবারগুলির কাছে অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো বা সঞ্চয় করার মতো বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়। উপভোক্তাদের স্বস্তি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বৃদ্ধি একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটি পরিবারের ক্রয়ক্ষমতাই ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকৃত পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বজায় রাখে। এর সুফল পরিবার থেকে শুরু করে খুচরো বিক্রেতা, সরবরাহকারী এবং উৎপাদনকারী–প্রত্যেকের কাছেই পৌঁছতে পারে। স্থানীয় স্তরের বাইরেও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছনোর একটি কার্যকর পথ তৈরি হলেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য জাতীয় বাজার মূল্যবান হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরের ব্যবসা-বাণিজ্যর উচিত স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি গ্রাহকদের সঙ্গে সুন্দর এক সম্পর্ক গড়ে তোলা। আবার, যেসব প্রতিষ্ঠান এসব শহরে তাদের কর্মসূচি সম্প্রসারিত করছে, তারাও স্থানীয় সরবরাহকারী ও পরিবেশকদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। জিএসটি-র অভিন্ন কাঠামো এই যোগাযোগগুলিকে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বর্তমানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজতর হওয়ার ফলে এই সম্পর্কগুলি বজায় রাখাও সহজ।
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে পণ্য পরিষেবা কর বা জিএসটি সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২.৪৬ লক্ষ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৬% বেশি।
এই কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার হার বেশ উল্লেখযোগ্য। আগস্ট মাসের শেষে কেন্দ্র ও রাজ্য– দুয়ের আওতায় থাকা সংস্থাগুলির জিএসটি রেজিস্ট্রেশনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৭১ কোটি, আগের বছরের তুলনায় যা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। এপ্রিল-জুলাই সময়কালে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দাখিল করা জিএসটিআর-থ্রিবি রিটার্নের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২.৬ শতাংশ বেশি ছিল। এই অগ্রগতির ফলে প্রশাসনের উপরও একটি দায়িত্ব বর্তায়। সেটি হল: নির্ভরযোগ্য পরিষেবা, স্পষ্ট নীতি নির্দেশিকা এবং বিভিন্ন সমস্যার সময়মতো সমাধানের মাধ্যমে যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিশেষ নিয়মিত নিয়ম-কানুন মেনে চলে, তাদের সহায়তা করা। এই প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: কার্যকর ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট। সংস্কার-পরবর্তী পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, ঋণের মাধ্যমে করের দায় মেটানোর হার বেড়েছে এবং করযোগ্য সরবরাহের তুলনায় জমে থাকা ঋণের পরিমাণ কমেছে। যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যোগ্য ঋণগ্রহীতা কার্যকর অর্থ ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বিষয়। ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কার্যকর মূলধন নির্ধারণ করে দেয় যে, তারা কতটা সহজে কাঁচামাল বা উপকরণ কিনতে পারবে, কোনও অর্ডারের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারবে কি না এবং পরবর্তী অর্ডারের দায়িত্ব নিতে পারবে কি না।
অর্থ ফেরতের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে প্রায় ১.৮০ লক্ষ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়া একটি সুষ্ঠু কর ব্যবস্থারই অংশ। এই প্রক্রিয়ায় বেশি পরিমাণ নিশ্চয়তা থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলি আরও আস্থার সঙ্গে ক্রয় ও উৎপাদনের পরিকল্পনা করতে পারে। করদাতার প্রাপ্য রিফান্ড পাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক কার্যকারিতা পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
রাজ্যগুলির রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থাপণাও এখন বেশ শক্তিশালী। এই বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে, আইজিএসটি নিষ্পত্তির ভাগ-সহ তাদের মোট এসজিএসটি আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সম্পদ পরিকাঠামো ও জন পরিষেবা ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়। এর ফলে পারিবারিক স্তরে কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। ফলস্বরূপ এই অর্জনগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে, সেগুলি যেমন পরিবারগুলির আর্থিকভাবে স্বস্তি পাওয়ার চাহিদা বৃদ্ধি করে, ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করে, আবার সরকারি রাজস্ব উন্নয়নের ধারাকেও বজায় রাখতে সহায়তা করে। এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের আমাদের কী করতে হবে সে সম্পর্কেও ধারণা দেয়।
অর্থ ফেরতের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে প্রায় ১.৮০ লক্ষ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়া একটি সুষ্ঠু কর ব্যবস্থারই অংশ।
ক্রমশ বিকশিত একটি ব্যবস্থাকে অবশ্যই ক্ষুদ্রতর অংশীদারদের উপর আরোপিত ব্যয়ের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। তাদের সময় ও সম্পদ সীমিত। তাই রিটার্ন দাখিল, কর জমা দেওয়া বা অর্থ ফেরতের মত বিষয়গুলি প্রতিটি সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে তারা তাদের সম্পদ ও সময় ব্যবসার পরিচালনা ও সম্প্রসারণে আরও বেশি করে কাজে লাগাতে পারে। পরিষদের কাছে ৭ অক্টোবর যে প্রস্তাবগুলো পেশ করা হবে, তা রাজ্যগুলির সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমেই তৈরি করা হয়েছে। নিয়মকানুন মেনে চলার সময় ও খরচ কমানোর লক্ষ্যে এর রেজিস্ট্রেশন, রিটার্ন, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের সুষ্ঠু প্রবাহের মতো বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। করদাতাদের অভিজ্ঞতাই যাতে এই ব্যবস্থার বাস্তবায়নের মূল পথপ্রদর্শক হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
জিএসটির ক্রমবর্ধমান পরিপূর্ণতা সংস্কারের পরবর্তী ধাপের জন্য আমাদের এক শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। প্রত্যক্ষ কর সংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা, নিশ্চয়তা এবং করদাতাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণের অভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হয়। নির্ভরযোগ্য একটি কর ব্যবস্থা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাৎক্ষণিক দায়বদ্ধতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলপ্রসু সুযোগগুলিতে বিনিয়োগ করতে সাহায্য করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি যেখানেই নিজেদের কর্মসূচি বাস্তবায়িত করুক না কেন, তাদের মধ্যে এই আস্থা অর্জিত হলেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরিকল্পিত ‘বিকশিত ভারত’-এর অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা সহজ হবে।
