Hashtagintro

জীবনযুদ্ধে পরাজয় মেনে নিয়েছেন ‘যোগ্য শিক্ষক’ স্বামী, উমার কাছে বিচারের আশায় সদ্য বিধবা স্ত্রী

মা গো আমায় ছুটি দিতে বল… অবশেষে ছুটি পেয়েছেন তিনি। অযাচিত কুয়াশার চাদরে ভবিষ্যত ঢেকে যাওয়ার বেদনা নিয়ে চলে গিয়েছেন অচিন মেঘের দেশে। কাশফুল, শরতের আকাশে, আলোর বিচ্ছুরণেও তাঁর দেখা মেলে না আর। সৌমেন বন্দ্যোপাধ্যায় পেশায় ছিলেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। কাটোয়ার বাসিন্দা এই ‘যোগ্য শিক্ষক’ পড়াতেন বীরভূমের রামনগরের এক স্কুলে। যোগ্য-অযোগ্য টানাপোড়েন, চাকরি হারানোর আশঙ্কায় চলতি বছরের মে মাসে মৃত্যুকে আপন করেছেন মেধাবী ছেলেটি। ৫ মাসের সন্তান, স্ত্রী দীপান্বিতা এবং অনেক স্বপ্নকে ফেলে বিদায় নেন তিনি। কাটোয়ার ক্রীড়াপ্রেমী মেধাবী ছেলের এরপর আর পড়ানো হয়নি স্কুলে, মিলেছে আজীবনের ছুটি। এক লহমায় শেষ হয় সব। বিনা মেঘে বজ্রাঘাত নামে সদ্য মা দীপান্বিতার জীবনে।

Durga Puja 2026: Teacher Husband unalives himself, Widow Seeks Justice
গুলিয়ে গিয়েছে হিসেবনিকেশ। বেদনার স্মৃতিতে ভরে সব! ছবি- ব্রতীন কুণ্ডু

দীপান্বিতা বলছেন, ‘‘ও একা হয়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেছি, বারবার বুঝিয়েছি, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছি। কিন্তু পারিনি আর! গ্রীষ্মের ছুটিতে স্কুল যাওয়া বন্ধ হল, আরও খারাপ হল পরিস্থিতি। উনি ঘুমোতেন না। রোজ মাঠে যেতেন, সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শেষের দিকে বাচ্চাটার কাছেও যেতেন না।’’ একদিন সকালে নিজেকে শেষ করে দেন স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক সৌমেন। বর্তমানে বাবা-মা-দাদার সঙ্গে অসম লড়াইয়ে দীপান্বিতা। তিনি বলছেন, ‘‘আমার সন্তান আছে, আমি তাই আছি। না হলে আমি যে কী করতাম, জানি না! ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যদি কিছু পাওয়া যায়। কাজ করতে হবে।’’ বিয়ের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ‘অকারণে’ স্বামী হারিয়ে তাঁর আক্ষেপ, ‘‘তখনকার সরকার যদি চাইত, পারত। বর্তমান সরকারের কাছে আবেদন করব, এরকম ঘটনা আর যেন না ঘটে। যাঁরা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী আছেন, তাঁদের কথা যেন সরকার আরও ভাবে। সবাইকে যেন সরকার দেখে।’’

শেষদিন শুধু নয়, নিরন্তর ভালোবাসার মানুষের কথা মনে পড়ে অঙ্কের ছাত্রীর। গুলিয়ে গিয়েছে হিসেবনিকেশ। বেদনার স্মৃতিতে ভর করে সব! এক সন্তানের মা বলছেন, ‘‘এখন মনে হয়, যে চাকরির জন্য ওকে চলে যেত হল, সেই চাকরির কী মূল্য? যখন আমি অন্তঃসত্ত্বা, স্কুলে ছুটি নিয়ে হলেও সব কিছু ও করেছে। ও চাইত ছেলেকে ভালো করে মানুষ করবে।’’ কিন্তু চাকরি না গেলেও, আশঙ্কার দোলাচলে কেন ভুগতেন ‘যোগ্য’ শিক্ষক সৌমেন? তাঁর স্ত্রী বলছেন, ‘‘আন্দোলনে যেত। বাড়িতে এসে বলত, কেন এমন হল আমাদের সঙ্গে? কিছুই বুঝতে পারত না। আরও অনেক পেশা আছে, বোঝাতাম। কিন্তু ওর জীবনের স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হবেই। ও এমন করবে ভাবতে পারিনি।’’

শেষ দিন ঠিক কী হয়েছিল? দীপান্বিতার দাবি, ‘‘ও বলত, ‘আমি চলে যাব, লোকে কী ভাববে? আমি মেধাবী, আমার সঙ্গে কী হল!’ চিকিৎসককে গিয়ে বলেছি সে কথা। ওকে বুঝিয়েছি বারবার। একটা সময় পর্যন্ত ও খুব আশাবাদী ছিল। সেদিন স্কুলের খাতা দেখছিল ঘুম থেকে উঠে। একসঙ্গে বসে খেলাম। ওষুধ খাওয়ার কথা বলছিলাম। আমি অন্য ঘরে ছিলাম। মুহূর্তেই এসব ঘটিয়ে ফেলল।” চোখের জল আর বাধ মানে না কাটোয়ার মেয়ের! তাঁর কথায়, ‘‘এটাতে তো ওদের কোনও দোষ নেই। আমি জানতাম দ্বিতীয়বার পরীক্ষা হলে হয়তো সবার পাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু পরের পরীক্ষাতেও পাশ করল, ইন্টারভিউ হল।’’

২০১৯ নাগাদ আলাপ দু’জনের! তারপর বিয়ে। সৌমেন-দীপান্বিতার ভালোবাসার সংসারে অভাব ছিল না কিছুর! সৌমেনের স্ত্রী বলছেন, ‘‘সব ঠিকঠাক চলছিল। ২০২৩ সাল অবধি বেশিরভাগ সময় স্কুলের এলাকাতেই থাকত। স্কুলটাকে ও নিজের বাড়ি মনে করত।’’ তাঁর হারিয়ে যাওয়ায় দীপান্বিতার জীবনে শুধুই অন্ধকার! লোকে কী বলবে? যোগ্য হয়েও চাকরি হারানোর আশঙ্কা কুড়ে কুড়ে খেয়েছিল তাঁকে! তাঁর শিরা-উপশিরায় বইত মনখারাপের কালো স্রোত!

দীপান্বিতা বলছেন, ‘‘সবটাই কঠিন, ছেলেটাকে কীভাবে বড় করব আমি জানি না! ‘চাকরির জন্য কেউ এমন করে?’ এরকম অনেকেই বলেন! আর বোঝাতে চাই না তাঁদের। চুপ করে থাকি, খারাপ লাগে।’’ পুরনো কথা বলতে গেলেই কেঁপে ওঠেন ‘যোগ্য’ শিক্ষকের স্ত্রী! তিনি পারেন, তিনি লড়েন, কিন্তু হাত ধরবেন কে? ১১ মাসের সন্তানের মায়ের জীবনে রয়েছে কঠিন সামাজিক অসুখের বিড়ম্বনাও! তবুও দীপান্বিতা বলেন, ‘‘যেখানেই থাকুক, শান্তিতে থাকুক আমার সৌমেন, আর কিছু ঠাকুরের কাছ থেকে চাওয়ার নেই।’’

Source: Sangbad Pratidin Education (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Education (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language