বিচারক ও সরকারি আধিকারিকদের স্ট্যাম্প ও সই জাল করে ভুয়ো নথি তৈরির ছক! বড়সড় কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস করল বর্ধমান থানার পুলিশ। কোর্ট কম্পাউন্ড চত্বরে থাকা একটি ডিটিপি-জেরক্স দোকানে বসেই চলত বেআইনি এই কারবার। মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে চার অভিযুক্তকে হাতেনাতে ধরে পুলিশ। ওই দোকান থেকেই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃতদের কাছ থেকে একাধিক ভুয়ো এফিডেভিট, বিচারক ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের ৪টি স্ট্যাম্প ও সিল এবং আইনজীবী রামকৃষ্ণ পালিতের নামে একটি স্ট্যাম্প ও সিল উদ্ধার হয়েছে। এছাড়াও নগদ ৫০ হাজার ৫২০ টাকা বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। বুধবার ধৃতদের বর্ধমান আদালতে পেশ করা হয়। বিচারক ধৃতদের ১০ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। ধৃতদের মধ্যে দুজন ল’ক্লার্ক। ইতিমধ্যে ধৃত চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। বড়সড় চক্রের পিছনে আর কোনও মাথা আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতরা হল দেওয়ানদিঘি থানার শোনপুর ভিটার বিবেকানন্দ ঘোষ, বর্ধমানের কাঞ্চননগরের টোটন দাস, শহরের রানিগঞ্জ বাজারের রাতুল পাল ও খণ্ডঘোষের চা গ্রামের কিশোর জুই। তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে বিবেকানন্দ ওই দোকানের কর্মচারী। সেই এই বেআইনি চক্রের মূল মাথা। মূলত খদ্দের জোগাড় করার কাজ করত রাতুল পাল ও কিশোর। আর টোটন ওদের প্রয়োজন মতো স্ট্যাম্প, সিল বানিয়ে দিত। জেলাশাসকের দপ্তরের অদূরে ধৃতের স্ট্যাম্প তৈরির গুমটি দোকান রয়েছে। রাতুল ও কিশোর ল’ক্লার্ক। পশ্চিমবঙ্গ ল’ক্লার্ক অ্যাসোসিয়েশন সদস্য এই দুইজন।
বিভিন্ন প্রয়োজনে এফিডেভিট করানোর প্রয়োজন হয়। জমি, বাড়ির নথি তৈরিতে, নামপদবী পরিবর্তন, ওয়ারিশন সার্টিফিকেট-সহ বিভিন্ন কাজে অপরিহার্য এফিডেভিট। কোনও ক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের এফিডেভিটের প্রয়োজন হয়। আবার কোনও ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকের এফিডেভিটের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে যিনি এফিডেভিট করাচ্ছেন তাঁকে সংশ্লিষ্ট এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আনুষঙ্গিক নথি নিয়ে হাজির হতে হয়। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পেরেছে তাঁরা এক্সিকিউটিভ বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজিরা ছাড়াই মোটা টাকার বিনিময়ে এফিডেভিট করিয়ে দিত। সেক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের স্ট্যাম্প, সই জাল করে স্ট্যাম্প পেপারে এফিডেভিট করে দিত। ফলে জাল নথি তৈরি করিয়ে নিতে পারত মোটা টাকা দিয়ে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, কোনও আসল নথি ছাড়াই যে কেউ এফিডেভিট পেয়ে যাচ্ছিল ধৃতদের কাছ থেকে। যা বিভিন্ন দুর্নীতিতেও ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। সেই এফিডেভিট কোন কোন অনিয়মের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ধৃতদের হেফাজতে নিয়ে এই চক্রে আর কেউ রয়েছে কি না তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অরূপ দাস বলেন, “আইন আইনের পথে চলবে। টাকার বিনিময়ে এমন বেআইনি করবার রুখতে পুলিশ কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে। এই ধরনের চক্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের পথে ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ।” পশ্চিমবঙ্গ ল’ক্লার্ক অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সভাপতি বিপত্তারণ আইচ বলেন, “ধৃতদের মধ্যে দুইজন ল’ক্লার্ক রয়েছেন। আমরা এই ধরনের কাজ সমর্থন করি না। ল’ক্লার্ক হয়ে খুবই নিন্দনীয় কাজ করেছে তারা। আইনের পথে ধৃতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।”
