বাড়ির মেয়ে কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়। লোকবিশ্বাস ও পারিবারিক জনশ্রুতি অনুযায়ী, পুকুরে তলিয়ে যাওয়ার পরদিন ভোরে কলসি মাথায় নিয়ে ফিরে এসেছিলেন তিনি। এরপর তাঁর নির্দেশেই শুরু হয় কালীপুজো। প্রায় ৩০০ বছর ধরে দুর্গাপুরের আমরাই গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে কালী রূপে পুজো হয়ে আসছেন কল্যাণী। পরিবারের এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে রহস্যময় ঐতিহ্য।
কথিত আছে, প্রায় ৪০০ বছর আগে কাটোয়ার বন্দীঘাঁটি থেকে রত্নেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় আমরাই গ্রামের চ্যাটার্জিপাড়ায় এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর ছেলে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মেয়ে কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিন বান্ধবীদের সঙ্গে গ্রামের তামলা পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিলেন কল্যাণী। সেই সময় এক বান্ধবী জলে নামতেই তাঁর পায়ে কোনও কিছুর স্পর্শ অনুভব করেন। ভয় পেয়ে তিনি জল থেকে উঠে এসে কল্যাণীকে বিষয়টি জানান। এরপর সাহসী কল্যাণী নিজেই পুকুরের কালো জলে নামেন। কিন্তু আচমকাই জলে তলিয়ে যান তিনি। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামজুড়ে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। স্থানীয় প্রায় ৩০টি ধীবর পরিবারকে নিয়ে পুকুরে জাল ফেলে তল্লাশি চালানো হয়। তাতেও কল্যাণীর সন্ধান মেলেনি। এরপর পুকুরের পাড় কেটে জল বের করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সন্ধ্যা নেমে আসায় সেই কাজ বন্ধ রাখতে হয়। পুকুরপাড়ে ক্লান্ত হয়ে বসে থাকা বাবা রত্নেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভাই কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ঘুমের মধ্যেই স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে জানানো হয়, পরদিন ভোরে তামলা পুকুরের ঈশান কোণ থেকে কল্যাণী উঠে আসবেন। একই স্বপ্নাদেশ পান গ্রামের এক ঢাকিও। তাঁকে বলা হয়, ঢাক নিয়ে পুকুরের ওই নির্দিষ্ট স্থানে যেতে। পরদিন ভোরে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের বহু মানুষ পুকুরপাড়ে জড়ো হন।
জনশ্রুতি, সকলের সামনে এক বুক জল থেকে মাথায় একটি কলস নিয়ে উঠে আসেন কল্যাণী। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি আর মহিলাদের উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। এরপর কলস মাথায় নিয়ে চ্যাটার্জিপাড়ায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের জমিতে পৌঁছন কল্যাণী। সেখানে কলস নামিয়ে কালীপুজো করার নির্দেশ দেন বলে কথিত রয়েছে। সেই ঘটনা থেকেই পরিবারের মেয়ে কল্যাণীকে কালী রূপে পুজো করার প্রথা শুরু হয়। আজও সেই ঐতিহ্য মেনে আমরাই গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে পূজিতা হন কল্যাণী কালী। এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন ব্রহ্মকলস। পরিবারের দাবি, কল্যাণীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই কলস আজও মন্দিরে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। বছরে একবার কলসের জল পরিবর্তন করা হয়। সোনা, রুপো, তামা, কাঁসা ও পিতল-সহ বিভিন্ন ধাতু দিয়ে তৈরি পদ্মচিহ্নিত শ্রীযন্ত্র দিয়ে কলসটি ঢেকে রাখা হয়। কালীপুজোর রাতে তন্ত্রমতে দেবীর আরাধনা করা হয়। পুজোকে ঘিরে রয়েছে একাধিক রীতিনীতি ও বিশ্বাস। মন্দিরের পাশের জলাশয়েও বহু ভক্ত স্নান করেন। তাঁদের বিশ্বাস, কল্যাণী কালীর কাছে মনস্কামনা জানালে তা পূরণ হয়।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ব্রহ্মকলসের জল পান করে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার বিশ্বাসও রয়েছে ভক্তদের মধ্যে। তবে এগুলি মূলত দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস ও পারিবারিক জনশ্রুতির অংশ। কালীপুজোর পরদিন কয়েক হাজার মানুষকে ভোগপ্রসাদ খাওয়ানোর ব্যবস্থাও করা হয়। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই পুজোয় আজও মিশে রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাস।
