‘ঢেউ’ শুধু তরঙ্গ নয়, সময়, শক্তি ও পরিবর্তনের প্রতীক। সাহিত্য, বিজ্ঞান ও জীবনের নানা প্রবাহে তারই বহুমাত্রিক প্রকাশ।
‘ঢেউ’- পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম শব্দের একটি। তবু বুকের মধ্যে ধারণ করে যুগযুগান্তরের তোলপাড়। প্রতিবাদ ও পরিবর্তনের অনুষঙ্গ। ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতীক ও প্রত্যয়। আবার ‘ঢেউ’ শব্দটি অনেক বাঙালি-মনে জাগিয়ে তুলবে শচীনকর্তার গাওয়া সেই নজরুলগীতি- ‘পদ্মার ঢেউ রে/মোর শূণ্য হৃদয়-পদ্ম নিয়ে যা, যা রে।’
নদী থেকে সাগর- সকল তরঙ্গ মিশে আছে প্রতিটি মানুষের জীবনের সঙ্গে, মিশে আছে ক্ষমতার উত্থান-পতনের সঙ্গে, মিশে আছে সভ্যতা, রাজনীতি, বিচিত্র মতামত ও আদর্শের প্রবাহে। উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর বিখ্যাত সনেট ‘লাইক অ্যাজ দ্য ওয়েল্স’-এ মহাকালের প্রবাহকে তুলনা করছেন অসীম সমুদ্রের অফুরন্ত ঢেউয়ের সঙ্গে, বলছেন সব কিছু গ্রাস করবে সময়ের তরঙ্গ। তবু বেঁচে থাকবে কবিতা। শেক্সপিয়রের এই রোম্যান্টিক ভাবনা থেকে অনেক দূরে পা ফেললেন ভার্জিনিয়া উল্ফ তাঁর ‘দ্য ওয়েল্স’ উপন্যাসে। ছয় বন্ধু এবং তাদের জীবনে সময়ের ঢেউ নিয়ে এই আপাত উপন্যাস। এরা সময়ের তরঙ্গে অসহায় খড়কুটো। কিন্তু এই উপন্যাসে আরও একজন উপস্থিত। এবং সেই চরিত্র সম্পূর্ণ নীরব। যেন চিরকালের এক নিঃস্পৃহ দ্রষ্টা। সময়ের তরঙ্গ তাকে ছুঁতে পারে না। ভাবতে পেরেছিলেন এমন এক উপস্থিতি ভার্জিনিয়া উল্ফ!
রবীন্দ্রনাথের মতো নারীকে ঢেউ রূপে আর কোনও কবি এই ভাষায় ভালবাসতে পেরেছেন বলে মনে হয় না: ‘ওগো জলের রানী/ ঢেউ দিয়ো না, দিয়ো না ঢেউ দিয়ো না গো-/ আমি যে ভয় মানি।
ভয়ংকর বাস্তববাদী মহাকবি ব্যাসদেব ‘ঢেউ’ শব্দটির মধ্যে নিয়ে এসেছেন অনিবার্য শক্তি, দুর্নিবার ক্ষমতা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অষ্টম দিনে যে ভয়ানক ব্যূহ তৈরি করে কৌরবরা, যে ব্যূহ দেখে কেঁপে ওঠে দেবতাদের বুক, যে ব্যূহ যেন স্বয়ং নিয়তি। সেই ব্যূহের নাম দিয়েছিলেন ব্যাসদেব ‘ঢেউ’। সংস্কৃত নাম- ‘ঊর্মিব্যূহ’। এবং পৃথিবীতে তরঙ্গশক্তির যত বর্ণনা আছে, সম্ভবত ব্যাসদেবের বর্ণনাই শ্রেষ্ঠ। সেই বর্ণনা মহাভারতে আছে শ্রীকৃষ্ণর দেহত্যাগের পরেই। তাঁর তৈরি দ্বারকা নগরীকে আর রক্ষা করবে কে? ব্যাসদেবের বর্ণনায়, বিপুল গর্জনে আকাশ ছুঁয়ে এগিয়ে আসছে সমুদ্রের ঢেউ এবং ঈশ্বরহীন বেপরোয়া স্পর্ধায় পেরিয়ে যাচ্ছে, এই প্রথম, তার নির্ধারিত সীমারেখা এবং নির্মমভাবে গিলে ফেলছে জগতের সুন্দরতম সৃজন, কৃষ্ণকল্পনার দ্বারকা নগরী।
কিন্তু সত্যিই কি তরঙ্গ বা ঢেউয়ের এমন অপার ক্ষমতা? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এক আশ্চর্য উত্তর দিয়েছে এই প্রশ্নের। পদার্থবিজ্ঞান বলছে, ‘তরঙ্গ’ বা ‘ঢেউ’ আক্ষরিক অর্থে এক আন্দোলন। কিন্তু এই আন্দোলন শুধুমাত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সঞ্চার করে শক্তি। ‘ওয়েভ ইজ আ ডিস্টার্বেন্স হুইচ প্রপাগেটস এনার্জি অ্যান্ড মোমেন্টাম’। কিন্তু যে-মাধ্যম দিয়ে ঢেউ যায়, তার কণিকাগুলো সে নাড়াতে পারে না। শুধু কম্পন ধরায়! অথচ রাতের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা সমুদ্রের ঢেউ হোমার থেকে ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’-এর এস্কিলাস-সবার চোখে নিয়তির অমোঘ হাসি। তবে রবীন্দ্রনাথের মতো নারীকে ঢেউ রূপে আর কোনও কবি এই ভাষায় ভালবাসতে পেরেছেন বলে মনে হয় না: ‘ওগো জলের রানী/ ঢেউ দিয়ো না, দিয়ো না ঢেউ দিয়ো না গো-/ আমি যে ভয় মানি।
