Hashtagintro

নৈমিষারণ্যের নেপাল যোগ! হিমালয়ের দেশেই রয়েছে মহামানবের রহস্যসূত্র?

গুমনামি বাবাই  কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’।

“আমি যদি মুখ খুলি, সারাদেশে আগুন জ্বলে যাবে!” উকিল দুর্গাপ্রসাদ পাণ্ডের এই উক্তি সামগ্রিকভাবে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র রহস্যে এক নির্ণায়ক দিকে নির্দেশ করে। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল সন্ন্যাসীকে। তার সমস্ত বই পত্র, ব্যবহৃত জিনিস, ধর্ম গ্রন্থ, প্রতি দিনের সংবাদপত্র, দেওয়ালে ঝোলানো মা কালীর ছবি, বসু পরিবারের পারিবারিক অ্যালবাম, বাবা জানকিনাথ বসু , মা প্রভাবতী দেবীর ছবি সমস্ত কিছু পড়ে রইল রামভবনের ঘরে। পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। একটা একটা করে তথ্যসূত্র পেয়ে খোঁজ করতে করতে ইনভেস্টিগেশন টিম যখন পুরানি বস্তিতে রাজা ময়দানের কাছে অ্যাডভোকেট দুর্গাপ্রসাদ পাণ্ডের কাছে পৌঁছালো, পাণ্ডেজিকে তারা বলেছিল তদন্তে যদি সাহায্য না করেন তাহলে তাঁর উপর আইনি কার্যকলাপ চলবে।

প্রাপ্ত নথিপত্রে পুলিশ জানতে পারে দূর্গাপ্রসাদ পাণ্ডে ছিলেন সন্ন্যাসী ভগবানজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুগামী। তাই তাঁকে ইন্টারোগেট করতে বদ্ধপরিকর ছিল পুলিশ ফোর্স। দুর্গাপ্রসাদ এ বিষয়ে কিছুই বলতে চাইছিলেন না। সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে দেওয়া শপথ থেকে তিনি বিপথে যাবেন কিভাবে? অথচ সত্যি কথা যদি বলতে হয়, তবে সুভাষচন্দ্রের পরিচয় সকলকে স্পষ্ট ভাবেই জানাতে হবে।

পুরানি বস্তির রাজা ময়দান। এখানেই সেরেস্তাখানায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র। রাজবাড়ি থেকে অদূরেই এই স্থান। উল্লেখযোগ্য এই ষাটের দশকেই বস্তি শহরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। রাজা প্রতাপনারায়ণ সিংকে কেউ প্রশ্ন করেছে কখনও, সুভাষবাবুকে আশ্রয়দান প্রসঙ্গে? না, প্রশ্ন ওঠেনি কখনও। ভগবানজির অবস্থান যে সত্য এখানেই উপলব্ধি করা যায়। দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় যখন সুভাষচন্দ্রের অবস্থান নিয়ে গুজব উঠেছে, অনেক প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এখানে প্রশাসনিক স্তর থেকে কখনওই প্রশ্ন উঠতে দেওয়া হয়নি। রহস্যজনক এই সত্য!

বাবার সঙ্গে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের গোপন আস্তানায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল দীপনারায়ণের।

জায়গাটা এখন বদলে গিয়েছে। কিন্তু এখান থেকে অদূরেই রয়েছে অ্যাডভোকেট দুর্গাপ্রসাদ পান্ডের বাড়ি। জায়গাটার সম্ভাব্য নাম নরহরিয়া। মাধুরী শুক্লা ম্যাডামকে তাঁর বাড়িতে রেখে আমাদের গাড়িতে সঙ্গী হয়েছিলেন তার পুত্র দীপনারায়ণ। তিনি এবার আমাদের নিয়ে চললেন দুর্গা প্রসাদের বাড়ির দিকে। অ্যাডভোকেট সাহেবের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁর ছেলে ভরত পান্ডে এখনও রয়েছেন। বাবার সঙ্গে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের গোপন আস্তানায় যাওয়ার সৌভাগ্য তাঁরও হয়েছিল। সেই স্মৃতির সম্ভার নিয়ে তিনি হাসিমুখে বসলেন আমাদের সঙ্গে। এই সম্পূর্ণ সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র রহস্যের প্রথম এবং প্রধান আকরগ্রন্থ সাংবাদিক অশোক ট্যাণ্ডনের লেখা “গুমনামি সুভাষ “-এর বাংলা এবং ইংরেজি অনুবাদ করেছি শুনে বেশ খুশি হলেন।

সাংবাদিক অশোকবাবুর জন্যই ভগবানজীর ইতিহাস প্রকাশ্যে এসেছে বলে তিনি জানালেন। পরবর্তীকালে অনেকেই সেই গবেষণা নিজের বলে প্রচার এবং প্রসার করেছে। কিন্তু অশোকবাবুর সেই রোমাঞ্চকর তথ্যানুসন্ধানের ব্যপ্তি আজ পর্যন্ত কেউ ছুঁতে পারেনি।

কোথাও সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের নিজের হাতের লেখা নোট, কোথাও বা অ্যাডভোকেট দুর্গাপ্রসাদ পাণ্ডের হাতের লেখা।

ভরত পান্ডে সবুজ ফাইলটা বের করলেন। ফাইল এর উপরে বাংলায় লেখা জয় দুর্গা। সন্ন্যাসীর হাতের লেখা বলেই মনে হয়। তার ভিতরে সাজানো থরে থরে চিঠি। অধিকাংশই ব্যক্তিগত পত্র। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন সংবাদপত্রের কাটিং। নেতাজি সংক্রান্ত বাংলা ইংরেজি হিন্দি সমস্ত সংবাদপত্রের কাটিং এবং তার পাশাপাশি কোথাও সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের নিজের হাতের লেখা নোট, কোথাও বা অ্যাডভোকেট দুর্গাপ্রসাদ পাণ্ডের হাতের লেখা। ইতিহাসের এমন অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার আমাদের এই সম্পূর্ণ অনুসন্ধান যাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করল।

এখানে না আসলে ভগবানজি রহস্যের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট আমাদের অধরাই রয়ে যেত। তিব্বতে সন্ন্যাসী তন্ত্রসাধনা করেছিলেন। প্রেত আবাহনের নানান রকম পদ্ধতি তিনি জানতেন। সেই সমস্ত ঘটনা শুনতে শুনতে আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছিল, স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যম ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে লেখা গ্রন্থ। সেখানে দক্ষিণ ভারতের এক প্রেতসিদ্ধ সাধুর সঙ্গে আলাপের কথা রয়েছে। তিব্বত প্রসঙ্গে এইসব কথা অবিশ্বাস্য মনে হয় না। ভারতের অথবা বাংলার পরিসরে মার্কসবাদীদের জনক বলা যায় বিবেকানন্দের ছোট ভাই ডক্টর ভুপেন্দ্রনাথ দত্তকে। নৃতত্ববিদ্যার উপর তার অধিগত জ্ঞান সম্বল করে লেখা গ্রন্থ “Mystic Tales of Lama Taranath”।

এই বৈপ্লবিক আবহ ও পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা সুভাষচন্দ্রের মনস্তত্ত্ব। অজ্ঞাত জীবনে তিনি রাজনীতি ত্যাগের পরে সেই রহস্যসন্ধানী জীবন অতিবাহিত করবেন এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সন্ন্যাসী এক পত্রে দেশনেত্রী লীলা রায়কে জানিয়েছিলেন, “It was Dilip who always made me mystic.” সেই mystic সুভাষচন্দ্রের এমন জীবনী স্বাভাবিক। অনেক রাত্রি করে আমরা ফিরলাম অযোধ্যায়। সন্ন্যাসীর রহস্যময় জীবন সম্পর্কে শোনা ঘটনাগুলো পাক খেয়ে ফিরছে মাথার মধ্যে। চোখের জল সামলানো যায় কিন্তু মনের বেদনা স্রোত থামাবো কীভাবে?

সাংবাদিক বিশ্বম্ভর আরোরাকে বিদায় জানিয়ে আমরা রওনা দিলাম নৈমিষারণ্যের উদ্দেশে। সীতাপুর জেলার অন্তর্গত এই পবিত্র স্থানে দীর্ঘদিন অজ্ঞাতবাস করেছেন সুভাষবাবু।

নৈমিষারণ্য! এই জায়গায় না গেলে আমাদের সম্পূর্ণ ট্রিপ অপূর্ণ রয়ে যাবে। হাতে সময় নেই। লখনউতে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের স্মৃতিচিহ্ন দেখার দীর্ঘদিনের ইচ্ছাকে দমন করে সকালে লখনউ পৌঁছে সাংবাদিক বিশ্বম্ভর অরোরার সাক্ষাৎকার নেওয়া হল। গবেষক কুণাল বসুর “আই অ্যাম বোস” চ্যানেলের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। এর প্রধান কারণ সরেজমিনে তদন্ত। আরোরাজির সাক্ষাৎকার তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছে আমরা জানতে পারলাম, ভগবানজির অনুগামী পন্ডা রামকিশোর মিশ্রার স্ত্রীর সাক্ষাৎকার তিনি নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত তা অর্থানুকূল্যে অন্যত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। ভগবানজিকে নিয়ে তৃতীয় পক্ষের কিছু মানুষ অযাচিতভাবে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি প্রদর্শন করছে বলে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত। নেতাজির রহস্য সন্ধানে একদিন এভাবে QR Code-এর অপব্যবহার হবে এ কথা কেউ কল্পনাতেও আনতে পারে না।

সাংবাদিক বিশ্বম্ভর আরোরাকে বিদায় জানিয়ে আমরা রওনা দিলাম নৈমিষারণ্যের উদ্দেশে। সীতাপুর জেলার অন্তর্গত এই পবিত্র স্থানে দীর্ঘদিন অজ্ঞাতবাস করেছেন সুভাষবাবু। নৈমিষারণ্যের ইতিহাস পর্যালোচনার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। উত্তরপ্রদেশের সীতাপুর জেলায় অবস্থিত নৈমিষারণ্যের চক্রতীর্থ হিন্দুদের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার প্রেরিত মনোময় চক্র যেখানে পতিত হয়েছিল, সেই স্থানেই চক্রতীর্থের উৎপত্তি। কথিত আছে, চক্রের আঘাতে ভূমি বিদীর্ণ হয়ে সেখানে জলধারার সৃষ্টি হয়। মহাভারত ও বিভিন্ন পুরাণে নৈমিষারণ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রাচীনকালে এই অরণ্যে শৌনক ঋষি-সহ বহু মুনি-ঋষি যজ্ঞ, তপস্যা ও শাস্ত্রচর্চা করতেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, চক্রতীর্থের পবিত্র জলে স্নান করলে পুণ্যলাভ হয়। পৌরাণিক ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য ও প্রাচীন ঋষিদের সাধনভূমি হিসেবে নৈমিষারণ্যের চক্রতীর্থ আজও অসংখ্য পুণ্যার্থীর কাছে বিশেষ শ্রদ্ধার স্থান। এখানে আশ্রয় নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ, নেপাল থেকে এই অঞ্চলে যাতায়াতের পথ রয়েছে। চক্রতীর্থের পাশে শিবালয়ে থাকতেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র। সেই জায়গাগুলোর বর্ণনা বিস্তারিতভাবে দিয়েছেন রাজকুমার শুক্লা। সেই মৌখিক বিবরণ সম্বল করেই আমাদের যাত্রা। সন্ধে ঘনিয়ে এসেছিল নৈমিষারণ্যে প্রবেশ করতে করতে।

বেশ কিছু জায়গার সন্ধান আমাদের দিয়েছেন সদ্য প্রাক্তন পুলিশকর্তা অশোক পাণ্ডে। সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের রহস্য সন্ধানে চাকরি থেকে ভিআরএস নিয়ে তিনি অনুসন্ধানে ব্রতি হয়েছেন।

২০২৬ সালে এসেও জায়গাটা এতটা শুনশান, গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে। পথ চলতি মানুষকে জিজ্ঞেস করতে করতে রাস্তা খুঁজে চললাম আমরা। গুগল ম্যাপে সবকিছু পাওয়া যায় না এখনও। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে হরপ্রসাদ দীক্ষিৎ, মাতা প্রসাদ দীক্ষিৎ, রাজেশ্বর ত্রিবেদী প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের যাঁরা সুভাষবাবুকে এখানে দেখেছিলেন। অবশ্য এদের অনেকেরই আর জীবিত থাকার কথা নয়। বেশ কিছু জায়গার সন্ধান আমাদের দিয়েছেন সদ্য প্রাক্তন পুলিশকর্তা অশোক পাণ্ডে। তিনি এক অদ্ভুত মানুষ। সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের রহস্য সন্ধানে চাকরি থেকে ভিআরএস নিয়ে তিনি অনুসন্ধানে ব্রতি হয়েছেন। সীতাপুর জেলার নানা প্রান্তে তিনি আজও নিজের ছোট্ট দল নিয়ে উপকথা রহস্য কথার সন্ধান করে চলেছেন।

অশোক পান্ডেজির সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ছিল, তবে সময়ের অভাবে তার হয়ে ওঠেনি। নৈমিষারণ্যে হোটেলের সন্ধান করতে বেশ বেগ পেতে হল। সন্ধ্যে সাতটায় এখানে নিঝুম রাত্রি হয়ে নেমেছে। তাই আর কোন অনুসন্ধান চালানো সম্ভব হল না। আমরা ঠিক করলাম ভোরবেলায় উঠে বেরিয়ে পড়ব। হাতে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা সময়। রাত্রিবেলাটা আমরা বসলাম পুরনো নিউজ রিপোর্ট পড়তে। সাংবাদিক গবেষক কুণাল বসুর এই বিষয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। তাই নিউজ রিপোর্ট পরে অনুসন্ধান কীভাবে করতে হবে সেই নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপদেশ তিনি দিলেন আমাদের।

পরের দিন সূর্য ওঠার সঙ্গেসঙ্গে ঘুম ভাঙল আমাদের। ভোরবেলায় নৈমিষারণ্যের চক্র তীর্থে পবিত্রতার মাত্রা যেন বেড়ে ওঠে। পুন্যস্নানের স্বার্থে এসেছেন ধর্মপ্রাণ মানুষেরা। আর আমরা আমাদের ধর্মে ব্রতী। নৈমিষারণ্যের মাঝে জলাশয়টি চক্রকুণ্ড, ব্রহ্মার চক্র স্থাপিত হয়ে এই কুণ্ডের সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। সেই কুণ্ডকে ঘিরে ছোট ছোট মন্দির, প্রাচীনত্বের উপর সংস্কারের ছাপ। সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের এখানে অবস্থানের গল্প সকলেই জানে। যেন খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু বিস্তারিত হবে এই ঘটনা আমাদের বলতে পারেন হরপ্রসাদ দীক্ষিত পুরোহিত মশাই।

কাছেই এই ধর্মশালার নির্মিত হয় ১৯১১ সালে। সেখানেই রয়েছেন রাজেশ্বর ত্রিবেদীজি, যিনি পর্দার আড়াল থেকে সুভাষচন্দ্রকে সেখানে একটি ঘরে থাকতে দেখেছিলেন।

টোটো নিয়ে আমরা পৌছালাম সেই শিবালয়ে। মন্দিরের বাইরের অংশে সংস্কার ঘটেছে সময়ের নিয়মে। দূরে সেই প্রাচীন শিবালয়ের আশ্রয় স্থানগুলি রয়েছে। চারপাশে জঙ্গল হয়ে গিয়েছে। যাওয়ার পথ নেই সেই দিকে, তবে ভগবানজি যেখানে থাকতেন সেই ঘরগুলো দেখালেন বৃদ্ধ এক পুরোহিত মশাই। মন্দিরের বিগ্রহস্থান এবং ভিতরের অংশটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব মেনেই একই রাখা হয়েছে। ভগবানের এই উপাসনা গৃহে বসতেন সাক্ষাৎ ভগবান! মন্দিরের ছাদে উঠে আমরা সমগ্র অঞ্চলটা ভিডিও করলাম। গবেষক কুণাল বসু যতটা সম্ভব ইতিহাসকে ক্যামেরাবন্দি করল। “আই এম বোস” চ্যানেলে সম্পূর্ণটা সম্প্রচারিত হবে। সেখানে কাছেই রয়েছে হনুমান গরি মন্দির। একবার এই অঞ্চলে আইবি পুলিশের সারভিলেন্স মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাওয়ায় সুভাষবাবু কিছুদিন সেই মন্দিরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমরা দ্রুত ছুটলাম সেই মন্দির দেখতে।

নৈমিষারণ্যে চক্রতীর্থ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত হনুমান গড়ি মন্দির। এই প্রাচীন তীর্থক্ষেত্রের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ধর্মীয়স্থান। রামায়ণের পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রাবণের সহযোগী অহিরাবণের হাত থেকে শ্রীরামচন্দ্র ও লক্ষ্মণকে উদ্ধার করতে হনুমানজি পাতাললোকে গমন করেন। অহিরাবণকে বধ করে দুই ভাইকে কাঁধে নিয়ে তিনি পাতাললোক থেকে এই স্থানে আবির্ভূত হন বলে লোকবিশ্বাস। মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ প্রায় ১২ ফুট উচ্চতার হনুমানজির প্রস্তরমূর্তি, যেখানে তাঁর দুই কাঁধে শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ বিরাজমান। দক্ষিণমুখী হনুমানজির বিগ্রহের কারণে মন্দিরটি ‘দক্ষিণেশ্বর হনুমান’ নামেও পরিচিত। পৌরাণিক ঐতিহ্য ও ভক্তির আবহে হনুমান গড়ি নৈমিষারণ্যের তীর্থপরিক্রমায় এক বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। সেখানে গিয়ে পুরোহিতের কাছে মন্দিরটিতে সুভাষচন্দ্রের অজ্ঞাতবাসের বিষয়টি জানতে পারলাম বিস্তারিতভাবে। সেখানেই আমরা জানতে পারলাম মুরারকা ধর্মশালা প্রসঙ্গে।

কাছেই এই ধর্মশালার নির্মিত হয় ১৯১১ সালে। সেখানেই রয়েছেন রাজেশ্বর ত্রিবেদীজি, যিনি পর্দার আড়াল থেকে সুভাষচন্দ্রকে সেখানে একটি ঘরে থাকতে দেখেছিলেন। দ্রুত ছুটলাম আমরা সেদিকে। উচু উচু পুরনো সিঁড়িগুলো বেয়ে উঠতে লাগলাম। ধর্মশালাটি গোলাকার খিলান বিশিষ্ট প্রবেশদ্বার এবং বাতায়ন সম্বলিত। পুরনো সেই গঠন আজও বিদ্যমান। কলকাতার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরিবার মুরারকা। আজও সেই ধর্মশালার মালিক। বিংশ শতাব্দীর বিশ এবং ত্রিশের দশকে সুভাষচন্দ্রের অন্যতম প্রধান অর্থ সরবরাহ ছিল সেই সংস্থা। আমরা বুঝতে পারলাম সেই কারণেই সুভাষবাবু নৈমিষারণ্যের এই স্থানটিকে বেছে নিয়েছিলেন অজ্ঞাতবাসের জন্য।

১৯৬০ সালে সেই মন্দিরের নির্মাণকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর পুজো দেওয়ার সময় হরপ্রসাদ দীক্ষিতের কাছে এসেছিলেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র।

মুরারকা পরিবারের সন্ধান পেলাম। ঘনিষ্ঠ মহলে আজও তারা সুভাষবাবুর গল্প বলেন। ইতিহাসের রহস্যের মেঘ ভেদ করে ক্রমশ যুক্তিতর্কের বিন্যাসে সন্ন্যাসীর অজ্ঞাতবাস আমাদের মনন জগতে প্রতিষ্ঠা পেল। সময় ফুরিয়ে এসেছে, যাত্রা শেষের পথে। শেষের দিকে বদ্রি নারায়ণ মন্দিরে হরপ্রসাদ দীক্ষিতের সন্ধান পেলাম। তাঁর মৃত্যু হয়েছে কিন্তু তাঁর পরিবার আজও সেই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ করে। ১৯৬০ সালে সেই মন্দিরের নির্মাণকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর পুজো দেওয়ার সময় হরপ্রসাদ দীক্ষিতের কাছে এসেছিলেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র। সেই রহস্য গোপন রাখার অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত হরপ্রসাদবাবু সেই কাহিনি কাউকে বলেননি। ক্রমে ইতিহাসের প্রয়োজনে সত্য প্রকাশের তাগিদে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে যা হওয়ার তাই হল। এই পোড়া দেশে ট্র্যাজিক নায়ক হয়েই থেকে গেলেন সুভাষচন্দ্র। অবশ্য নায়ক সব সময় ট্র্যাজেডিতেই বেঁচে থাকেন। ইতিহাস সাক্ষী!

আমরা এবার লখনউয়ের পথে রওনা হলাম। ফেরার পথে বেশ কিছু দিক নির্দেশ, গোপন স্থানের সংবাদ নিয়ে এলাম। নেপাল! নেপাল! এই রহস্যের সমাধান সুত্র সন্ধানে সেই হিমালয়ের কোলে পার্বত্য দেশ গন্তব্য। নেপালের রাজ পরিবারের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন সুভাষবাবু, সত্যের সন্ধানে এই পথেই যেতে হবে আমাদের। পরেরবার অবশ্যই সুভাষচন্দ্রের সন্ধানে নেপাল পর্যন্ত যাব আমরা!

(সমাপ্ত)

সৈকত নিয়োগী: ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র হলেও তাঁর নেশা ইতিহাস গবেষণায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক জীবন ও কর্ম বিষয়ে একাধিক গ্রন্থের রচয়িতা।

সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত: দর্শন ও ইতিহাসের ছাত্র। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তা-সহ একাধিক বিষয়ক গ্রন্থের রচয়িতা।

Source: Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language