কোথাও জ্বলে কয়েল, কোথাও প্লাগে লাগানো তরল বাষ্পীকারক। ধোঁয়া আর রাসায়নিকের গন্ধে রাত কাটে। সন্ধ্যা নামলেই বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে শুরু হয় মশার বিরুদ্ধে নিত্যদিনের লড়াই। অথচ সেই মশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্ভাব্য অস্ত্র হয়তো লুকিয়ে রয়েছে ঘরের উঠোনেই—পাকা পেঁপের কালো বীজে! ফেলে দেওয়া সেই বীজই মশার বংশবিস্তারে বাধা দিতে পারে কি না, সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন বাঁকুড়ার খ্রিস্টান কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অনুপম ঘোষ ও তাঁর সহ-গবেষকেরা। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ সম্ভাবনা—পেঁপের বীজের সক্রিয় উপাদান মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। অর্থাৎ, মশা পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠার আগেই তার জীবনচক্রে আঘাত হানার পথ খুলে দিতে পারে উঠোনের অতি পরিচিত এই কালো বীজ।
পেঁপের বীজ নিয়ে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি হয় ২০০৯ সালে। অনুপম ঘোষের সঙ্গে ছিলেন অঞ্জলি রাওয়ানি, কোয়েল মল্লিক হালদার ও গৌতম চন্দ্র। তিনটি উদ্ভিদের নির্যাস কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়াটাস মশার লার্ভার উপর প্রয়োগ করে তুলনা করা হয়। ফলাফলে পেঁপের বীজের নির্যাসই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে উঠে আসে। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ মশা তৈরি হওয়ার আগেই তার লার্ভা পর্যায়ে আঘাত করার সম্ভাবনাই গবেষণায় সামনে আসে। এর পর ২০১২ সালে গবেষণা আরও এক ধাপ এগোয়। অনুপম ঘোষ, অঞ্জলি রাওয়ানি, সুব্রত লস্কর ও গৌতম চন্দ্র পেঁপের কাঁচা বীজ ও বিভিন্ন দ্রাবক নির্যাস নিয়ে পরীক্ষা করেন।
এবার কিউলেক্সের পাশাপাশি ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস স্টিফেন্সিকেও পরীক্ষায় রাখা হয়। ০.১ থেকে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘনত্বে নির্যাস প্রয়োগের পরে দেখা যায়, ০.৫ শতাংশে তৃতীয় স্তরের লার্ভার মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষণার ফলাফলের সারকথা, পেঁপের বীজের সক্রিয় উপাদানকে নির্দিষ্ট মাত্রায় কাজে লাগানো গেলে মশা নিয়ন্ত্রণে তার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু লার্ভা নয়, পিউপা, পূর্ণাঙ্গ মশা এবং মশা তাড়ানোর ক্ষমতাও পরীক্ষা করা হয়। রাসায়নিক বিশ্লেষণে পেঁপের বীজে অ্যালিফ্যাটিক অ্যামাইড-জাতীয় সক্রিয় উপাদানের উপস্থিতির ইঙ্গিত মেলে। ফলে অনুপম ঘোষের গবেষণায় পেঁপের কালো বীজ আর নিছক ফেলনা অংশ নয়—মশার জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি উদ্ভিদ-উৎসের সম্ভাব্য উপাদান হিসেবেই সামনে এসেছে।