মানুষের জীবনে অতীত এমন এক অবিচ্ছেদ্য পর্ব যাকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব, আবার যাকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকলে এগিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। জীবন যেহেতু থেমে থাকে না তাই অতীত আমাদের জীবনে কতটা প্রভাব বিস্তার করবে সে সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়। যেমনটা নিতে হয়েছিল জয়কে। বিয়ের মাত্র দু’বছরের মাথায় স্ত্রীকে হারিয়ে জীবনের প্রায় সবটাই ধোঁয়াশা হয়ে উঠেছিল তার কাছে। এমন সময় দিওয়ালির জন্য তাকে বাধ্য হয়ে দিদার বাড়ি যেতে হল। রাধিকা বনসলের লেখা ও পরিচালনায় নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে ‘মিঠে মে কেয়া হ্যায়’ (Meethe Mein Kya Hai Review) ছবিটি।
অভিনয়ে ঋত্বিক ভৌমিক, রোহিনী হাত্তাঙ্গাড়ি, আয়েশা রাজা মিশ্র, গৌরব কে শর্মা, বিক্রম বক্সি প্রমুখ। জয় তার নানির বাড়িতে দিওয়ালি কাটাতে আসে কিছুটা বাধ্য হয়েই। বোন সানা কাউকে কিছু না জানিয়েই বিয়ে করে বসে আছে। এই অবস্থায় যুগলে বাড়ি গিয়ে পৌঁছলে ঘূর্ণিঝড় কিংবা সুনামি আসতে পারে, তাই দাদাকে তার প্রয়োজন। ঝড় আসে ঠিকই, কিন্তু জয়কে খুব কিছু সামলাতে হয় না। সকলে মিলেই সেই ঝড়ের মোকাবিলা করতে এগিয়ে আসে। সঙ্গে আরও অনেক ফেলে রাখা হিসেবেরও নিষ্পত্তি হয়। একটা সময় জয় নিজেও বুঝতে শুরু করে যে পরিবারের মুখোমুখি হতে সে চাইছিল না সেই পরিবারই তার সবচেয়ে বড় জোরের জায়গা। সব পরিবারেই নানা ধরনের মানুষ থাকে।

তাদের কেউ হয়তো আধপাগল, কেউ বা রাশভারী। কাউকে আমরা একটু বেশি ভালোবাসি আবার কাউকে নিয়ে নানান সমস্যা দেখা দেয় মাঝে মধ্যেই। কিন্তু এই ভরপুর বিশৃঙ্খলার মধ্যে থেকেই পারিবারিক বন্ধনের ভারসাম্য রক্ষা হয়। সবাই যদি খুব স্বয়ংসম্পূর্ণ হত তাহলে সবটাই গুরুগম্ভীর অঙ্কের মতো মিলে যেত। মেলে না বলেই জীবনে এত বৈচিত্র্য, এতরকম তার স্বাদ। একটানা মিষ্টি একঘেয়ে লাগে বলেই তো টক-ঝাল-নোনতার প্রয়োজন।সম্পূর্ণ পারিবারিক কাহিনি নিয়ে তৈরি এই ছবির দুটি বিশেষ দিক রয়েছে যা দর্শকদের শেষ অবধি বসিয়ে রাখবে। এক, গল্পের সারল্য।
চরিত্ররা সকলেই মানুষ হিসেবে আন্তরিক আর সহজ। যদিও সেটা বাস্তবসম্মত হয়তো নয়, কিন্তু সেই কারণেই ছবি জুড়ে একটা ফিল গুড আবহ তৈরি হয়। আর দুই, গল্প বলার মধ্যে ছিমছাম পরিমিতিবোধ রয়েছে যা দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে না। পরিচালক জানেন কোথায় কতটা সুতো ছাড়তে হবে। গল্পের আবেগের খাতিরে জোর করে সম্পর্কের সমীকরণ তৈরি করার চেষ্টা করেননি তিনি। এই সংযম প্রশংসনীয়। জয় ও মীরার অসমবয়সী বন্ধুত্বকে সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন পরিচালক।

তবে শেষের কিছু অংশ একটু কম টানা যেত। না-ই বা হল সবকিছু ছবির মতো পারফেক্ট, বাস্তবে তো তেমন হয়ও না। তবে গল্পের পরিণতির মধ্যে দিয়ে একটা উৎসবমুখর সম্পূর্ণ পরিবারের ছবি তৈরি হয়েছে, যা হয়তো ভারতীয় সংস্কৃতিকেই চিত্রিত করে। অভিনয়ে ঋত্বিক ভৌমিক অনবদ্য। সময়ের সঙ্গে তাঁর অভিনয় এখন আরও পরিণত এবং সংযত। নানি চরিত্রকে বর্ষীয়ান রোহিনী অসম্ভব দক্ষতায় মিঠেকড়া ধাঁচে গড়ে তুলেছেন। অন্যান্য অভিনেতারা সকলেই মানানসই। চিত্রগ্রহণ আগাগোড়া উৎসবের রেশ ধরে রেখেছে। চিত্রনাট্য ও সম্পাদনা আর একটু নিয়ন্ত্রিত হতে পারত। তবে সব মিলিয়ে আলোর উৎসবের প্রাক্কালে মন ভালো করা আশার গল্প শুনিয়ে যাবে
এই ছবি।
