Hashtagintro

পিঙ্ক অক্টোবর: স্তনে গাঁট থেকে ক্যানসার শনাক্ত, চিকিৎসার সাত অস্ত্রে কতটা বদলেছে লড়াই? বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা

স্তন ক্যানসার মানেই কি জীবনের আলো নিভে যাওয়া? মোটেই নয়। রোগটি যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনাও তত বাড়ে। অথচ সংকোচ, ভয় আর অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় শরীরের দেওয়া প্রাথমিক সংকেতও উপেক্ষিত থেকে যায়।

যে পরিবর্তনটি হয়তো সময়মতো চিকিৎসকের কাছে পৌঁছনোর বার্তা দিচ্ছিল, সেটিই একদিন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠে। তাই স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হোক রোগ ধরা পড়ার পরে নয়, তার আগেই, সচেতনতার হাত ধরে।

শরীরের ছোট্ট সংকেত, অবহেলা নয়
শরীর কখনও কখনও খুব নিঃশব্দে জানান দেয়, কোথাও কিছু বদলাচ্ছে। স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও তেমন কয়েকটি লক্ষণ রয়েছে, যেগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। স্তনের মধ্যে কোনও গাঁট বা শক্ত অংশ অনুভব করা তার অন্যতম। স্নানের সময় আঙুলের ডগায় মুসুর ডাল বা সুপুরির মতো কোনও গাঁট ধরা পড়লে তা অবহেলা করা চলবে না।

বিশেষ করে গাঁটটি যন্ত্রণাহীন হলে অনেকেই ভাবেন, চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু ব্যথা না থাকলেই যে বিপদ নেই, এমন নয়। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, স্তনবৃন্ত বা নিপল থেকে রক্তক্ষরণ। তৃতীয়টি হল স্তনের ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, বিশেষত স্তনবৃন্ত বা তার চারপাশের অংশে।

তবে স্তনে গাঁট মানেই ক্যানসার নয়। এই পরিবর্তনগুলির অন্য কারণও হতে পারে। কিন্তু কোনও লক্ষণকে অবহেলা করে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকাও ঠিক নয়। শরীরের স্বাভাবিক চেহারা বা অনুভূতিতে নতুন কোনও পরিবর্তন ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

breast cancer early detection treatment expert explains
বাড়ুক সচেতনতা। ছবি: প্রতীকী

নিজের শরীরের সঙ্গে পরিচয়, সচেতনতার প্রথম পাঠ
নিজের শরীরকে চেনা মানে শুধু তার যত্ন নেওয়া নয়, তার ভাষাও বুঝতে শেখা। স্তনের স্বাভাবিক গঠন কেমন, তা জানা থাকলে নতুন কোনও পরিবর্তন চোখে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। স্নানের সময় আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে বৃত্তাকারে স্তন পরীক্ষা করা যায়। বাঁ হাত দিয়ে ডান স্তন এবং ডান হাত দিয়ে বাঁ স্তন পরীক্ষা করতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুই স্তনের আকার, ত্বক ও স্তনবৃন্তের চেহারায় কোনও পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা-ও লক্ষ করা জরুরি।

যাঁদের ঋতুস্রাব হয়, তাঁরা ঋতুচক্র শেষ হওয়ার চার-পাঁচ দিন পরে এই পরীক্ষা করুন। যাঁদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তাঁরা মাসের একটি নির্দিষ্ট দিন বেছে নিন। তবে মনে রাখতে হবে, নিজে পরীক্ষা করা চিকিৎসকের পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়। কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক সাহায্যের জন্য আশা কর্মী বা কমিউনিটি হেলথ অফিসারের (সিএইচও) সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।

সন্দেহ থেকে নিশ্চিত হওয়ার পথ
কোনও লক্ষণ দেখা দিলে পরের ধাপ হল সঠিক পরীক্ষা। প্রথমে চিকিৎসক হাতে স্তন পরীক্ষা করেন। এই পদ্ধতির নাম ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এগজামিনেশন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ম্যামোগ্রাফি বা আলট্রাসোনোগ্রাফির মতো পরীক্ষা করা হয়। তৃতীয় ধাপ হল নিডল বায়োপসি, যেখানে সূচের সাহায্যে সন্দেহজনক অংশ থেকে সামান্য টিস্যু সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।

বায়োপসি নিয়ে অনেকের মনে ভয় থাকে, সূচের স্পর্শে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়বে না তো? এই ধারণা ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে বায়োপসি রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ সন্দেহকে দূরে সরিয়ে রাখলে তার উত্তর মেলে না; সঠিক পরীক্ষাই জানাতে পারে, শরীরের পরিবর্তনের পিছনে আসল কারণ কী।

breast cancer early detection treatment expert explains
জরুরি স্ক্রিনিং। ছবি: প্রতীকী

চিকিৎসার সাতটি অস্ত্র, আশার নতুন দিগন্ত
একসময় স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচার মানেই অনেকের মনে ভেসে উঠত সম্পূর্ণ স্তন বাদ যাওয়ার আশঙ্কা। আধুনিক চিকিৎসা সেই ধারণায় বদল এনেছে। এখন রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই স্তন ক্যানসার আক্রান্ত অংশটুকু বাদ দিয়ে বাকি অংশ অক্ষত রাখা সম্ভব। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্তন সংরক্ষণ করে অস্ত্রোপচারের সুযোগ থাকতে পারে। আবার প্রয়োজন হলে সম্পূর্ণ স্তন বাদ দেওয়ার পর পুনর্গঠন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্তনের আকৃতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও রয়েছে।

অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি চিকিৎসার আরও কয়েকটি পথ রয়েছে। রেডিওথেরাপির সাহায্যে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অবশিষ্ট ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয় শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে এমন ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে। কিছু স্তন ক্যানসারের বৃদ্ধি ইস্ট্রোজেনের মতো হরমোনের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় হরমোন-চিকিৎসা বা অ্যান্টি-ইস্ট্রোজেন থেরাপিও গুরুত্বপূর্ণ।

এর পাশাপাশি রয়েছে মলিকিউলার টার্গেটেড থেরাপি। সহজ করে বললে, ক্যানসার কোষের গায়ে থাকা নির্দিষ্ট রিসেপ্টর বা তার বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত অণুকে লক্ষ্য করে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করা হয়। তবে সব ধরনের স্তন ক্যানসারে এই চিকিৎসাগুলি সমান ভাবে কার্যকর নয়; রোগের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেও এখন চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেমন, BRCA1 বা BRCA2 জিনে নির্দিষ্ট পরিবর্তন থাকলে নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে ওলাপারিবের মতো ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি জিন থেরাপি নয়, বরং নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ। অর্থাৎ, চিকিৎসার পথ এখন আর একটিমাত্র নয়। রোগের ধরন বুঝে উপযুক্ত পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই বেড়েছে।

breast cancer early detection treatment expert explains
নিয়মিত শরীরচর্চায় কমে রোগের ঝুঁকি। ছবি: প্রতীকী

সময়ের সঙ্গে লড়াই, রোগ ধরা পড়ুক আগেই
স্তনের টিউমার দু’‌সেন্টিমিটারের কম আকারে শনাক্ত হলে চিকিৎসার সাফল্যের হার ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। ক্যানসারের ধরন, রোগের পর্যায় এবং চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার মতো বিষয়ও ফল নির্ধারণ করে।

ভারতে ২০১৭ সালে স্তন ক্যানসার-সহ কয়েকটি সাধারণ ক্যানসার শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে সরকারি স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করা হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথে মানুষকে এগিয়ে দেওয়া। নির্দিষ্ট বয়সে স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ সম্পর্কে জানা এবং নিজের বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

পাশ্চাত্য দেশগুলিতে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার সাফল্যের হার প্রায় ৯০ শতাংশ, যেখানে ভারতে তা প্রায় ৬০ থেকে ৬২ শতাংশ। এই পার্থক্যের পিছনে দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপনেও সচেতনতা
স্তন ক্যানসারের কোনও একটিমাত্র কারণ নেই। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের সংস্পর্শ এবং জীবনযাপনের নানা দিক মিলিয়ে রোগের সম্ভাবনা প্রভাবিত হয়। স্তন্যপান না করানো, সন্তান না হওয়া, কিছু ক্ষেত্রে হরমোন-চিকিৎসা, স্থূলতা এবং মদ্যপানের মতো বিষয় ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ধূমপানও এড়িয়ে চলা উচিত। তবে এগুলির কোনওটি থাকলেই যে ক্যানসার হবে, এমন নয়; আবার কোনও পরিচিত ঝুঁকির কারণ না থাকলেও রোগটি হতে পারে।

ইস্ট্রোজেনের সংস্পর্শে থাকার সময়কালও কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। খুব অল্প বয়সে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া বা বেশি বয়স পর্যন্ত ঋতুস্রাব চলার সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু শুধু এই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কারও রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং মদ্যপান এড়িয়ে চলা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ মিনিট শরীরচর্চা করলে স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা প্রায় ৩৩ শতাংশ কমতে পারে।

সংখ্যার আড়ালে বেঁচে থাকার গল্প
ভারতে প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ ৩৭ হাজার নতুন স্তন ক্যানসারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। বিশ্বে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা প্রতি আট জন মহিলার মধ্যে একজনের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। ভারতে এই সংখ্যা প্রতি ৩০ জনে একজন।

কিন্তু পরিসংখ্যানের আড়ালে শুধু সংখ্যা থাকে না, থাকে একটি মুখ, একটি পরিবার, বেঁচে থাকার স্বপ্ন। তাই স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা মানে শুধু রোগকে চেনা নয়, ভয় আর সংকোচের অন্ধকার পেরিয়ে চিকিৎসার আলোয় পৌঁছনো। সব ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায় না। কিন্তু সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা যায়।

গোলাপি অক্টোবরের অঙ্গীকার তাই শুধু একটি মাসের নয়—নিজের শরীরের ভাষা বোঝার, পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়ার, আর জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর। কারণ সচেতনতার হাত ধরেই অনেক সময় ভয়ের ওপারে অপেক্ষা করে নতুন ভোর।

Source: Sangbad Pratidin Lifestyle (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Lifestyle (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language