পুজো মানেই মিষ্টি। বাড়িতে অতিথি এলেই মিষ্টির বাক্স, পুজোমণ্ডপ থেকে ফিরেও মিষ্টি, আবার খাওয়ার পর ডেজার্ট। তার সঙ্গে মিষ্টি পানীয়, ভাজাভুজি ও জাঙ্ক বা ফাস্ট ফুড তো রয়েছেই। ফলে উৎসবের মরশুমে অজান্তেই শরীরে ঢুকে পড়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শর্করা ও ক্যালরি।
এক-আধ দিন একটু বেশি মিষ্টি খেলেই লিভারে চর্বি বা ফ্যাট জমে যাবে, এমন নয়। আসল সমস্যা হল দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস। এর সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং বিপাকীয় সমস্যা যুক্ত হলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। তৈরি হতে পারে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা এমএএসএলডি, যা আগে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা এনএএফএলডি নামে পরিচিত।
মিষ্টি গিয়ে পৌঁছয় লিভারেই
খাবারের কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি হয়। শরীর প্রয়োজনমতো তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। অন্য দিকে, ফ্রুক্টোজের বিপাক মূলত লিভারেই হয়। নিয়মিত বেশি পরিমাণে ফ্রুক্টোজ বা অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে ঢুকলে লিভার অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটের একাংশকে ফ্যাটি অ্যাসিডে রূপান্তর করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ডি নোভো লিপোজেনেসিস। দীর্ঘদিন এই প্রক্রিয়া চললে লিভারের কোষে চর্বি জমতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, উৎসবের সময়ে অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে পরিশোধিত শর্করা, বিশেষ করে ফ্রুক্টোজের চাপ সামলাতে হয় লিভারকে। অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ লিভারে ডি নোভো লিপোজেনেসিসের মাধ্যমে চর্বিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
তবে একটি সন্দেশ বা দুটো রসগোল্লা ফ্যাটি লিভারের কারণ নয়। ফ্যাটি লিভারের পিছনে অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু মিষ্টি নয়, পানীয়ও
উৎসবের সময়ে মিষ্টির পাশাপাশি ঠান্ডা পানীয়, মিষ্টি লস্যি, প্যাকেটজাত জুস বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা-কফি থেকেও শরীরে বাড়তি শর্করা ঢোকে। বিভিন্ন গবেষণায় বেশি পরিমাণে চিনি-মেশানো পানীয় পানের সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু একটি মিষ্টিতে নয়। সমস্যা তৈরি করে দিনের পর দিন অতিরিক্ত মিষ্টি, অতিরিক্ত ক্যালরি এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।

লিভারে চর্বি মানেই ক্ষতি?
সবসময় নয়। লিভারে চর্বি জমলেই সঙ্গে সঙ্গে প্রদাহ বা লিভারের কোষের ক্ষতি হবে, এমন নয়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যা ধীরে ধীরে এগোতে পারে। লিভারে চর্বির সঙ্গে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি যুক্ত হলে তাকে বলা হয় মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোহেপাটাইটিস। দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসারের মতো জটিলতাও হতে পারে।
কতটা শর্করা অতিরিক্ত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র পরামর্শ, খাবারে থাকা ফ্রি সুগার দৈনিক মোট ক্যালরির ১০ শতাংশের কম রাখা উচিত। আরও ভালো ফল পেতে তা ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। দৈনিক ২০০০ ক্যালরির খাদ্যাভ্যাসে ১০ শতাংশ প্রায় ৫০ গ্রাম ফ্রি সুগারের সমান।
উৎসবের সময়ে হিসাবটা সহজেই গুলিয়ে যায়। মিষ্টির সঙ্গে মিষ্টি পানীয়, ডেজার্ট ও প্যাকেটজাত খাবার যোগ হওয়ায় মোট শর্করা দ্রুত বেড়ে যায়।

মিষ্টি খান, কিন্তু মেপে
যাঁদের ফ্যাটি লিভার, স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি, তাঁদের অতিরিক্ত চিনি নিয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা দরকার। ফ্যাটি লিভার অনেক সময় কোনও উপসর্গ শরীরে বাসা বাধে। তাই শরীর ভালো আছে মানেই লিভারও ভালো আছে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পুজোয় মিষ্টি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। অল্প পরিমাণে খান, মিষ্টি পানীয় এড়িয়ে চলুন, খাবারে শাকসবজি ও প্রোটিন রাখুন এবং নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চার অভ্যাস বজায় রাখুন। একটি রসগোল্লা লিভার নষ্ট করে না। কিন্তু উৎসবের মিষ্টি যদি প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে যায়, তখনই বাড়ে বিপদ। আনন্দ থাকুক, মিষ্টিও থাকুক, শুধু বাড়াবাড়িটা নয়।
