দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার, কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার! এবড়ো খেবড়ো রাস্তা, কঠিন জীবনের পথে এই রানার ছোটেন সর্বদা! সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখার তাগিদে রাতবিরেতে ছুটে চলেন দূর-বহু দূরে! তাঁর জীবনে শুধুই ব্যস্ততা, দশ-পনেরো ঘণ্টা নিরলস কাজের পর যেটুকু আসে, তাতে ভালোভাবেই চলে সংসার। ‘গিগ’ অর্থনীতির ধারক, বহু বহু রানারের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান। বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনার কদম্বগাছি এলাকার বাসিন্দার সর্বক্ষণের পেশা অ্যাপনির্ভর বাইক চালানো। কখনও বারাসত থেকে বেহালা, কখনও আবার সাঁতরাগাছি থেকে রাজারহাট। মিজানুর পেটের টানে কোটি কোটি গিগ শ্রমিকের মতো ছুটে চলেন। কাজের তেমন কোনও নিশ্চয়তা না থাকলেও ওঁরা কাজ করেন আনন্দে!

পুজোয় রাস্তায় তীব্র যানজটেও মিজানুরের মতো বহু অ্যাপনির্ভর বাইক চালক কাজে বেরন। কারণ, বহু কোম্পানি একটু বেশি টাকা দেয়, আবার কোনও কোনও যাত্রী পুজোয় ‘বোনাস’ দেন ওঁদের। পুজো অনেকের ভালো কাটে, কেউ আবার ইচ্ছা করলেও বাড়িতে যেতে পারেন না! শহরের কোনও ঘুপচি ঘরে বালিশের ভেজা গন্ধে শোনেন আগমনীর সুর! দেবী দুর্গার আগমন, ওঁদের কাছে বিবেচিত হয়ে ওঠে ভালো থাকার রসদ হিসেবে। রাত-বিরেতে খারাপ-ভালো, ‘একটু বাড়িয়ে দেবেন’ বদনাম, অথবা কখনও কখনও বহু অভিযোগের পাহাড় থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষিতের বসবাস এই গিগের জগতেই! কেউ পার্ট-টাইম। কেউ আবার ফুল-টাইম। পেটের টানে চলে সব।
মিজানুরের পরিবারে মা, স্ত্রী আর দুই সন্তান। কোমর ধরে গেলেও দুর্গা পুজোর উৎসবের প্রতিদিন রাতে একটু বেশি আয়ের আশায় বেরিয়ে পড়েন অন্যত্র। দু’চাকায় খোঁজেন বাঁচার স্বপ্ন, বাঁচানোর স্বপ্ন! মিজানুর বলছেন, “এই বাইক আমার জীবন। ওর জন্যই বেঁচে আছি। পুজোয় অনেক অসুবিধা রয়েছে, যানজট হয়। ট্রিপ শেষ করতে সময় লাগে। কিন্তু পুজোয় কাজ করলে আয় অন্য দিনের তুলনায় ভালো হয়। অন্তত পরের সপ্তাহে কাজ করলেও চিন্তা থাকে না!”
বছর পাঁচেকের বেশি সময় এই পেশায় ওই যুবক। তার আগে ওষুধের কোম্পানিতে কাজ। উচ্চমাধ্যমিক পাশ ছেলেটির সরকারি চাকরি করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু দারিদ্র্য তাঁকে এগোতে দেয়নি আর! ধর্মের টানাপোড়েন শুনতে ভালো লাগে না মিজানুরের। তাঁর কথায়, “দুর্গা পুজোয় আমরা বেরোই পেটের টানে, কাজের তাগিদে। আমার কাছে সবটাই উৎসব!” তাঁর দাবি, ‘‘কিছু মানুষের মধ্যে ধর্মের গোঁড়ামি আছে। আসলে ৯৯ শতাংশ মানুষ ভালো। সব ধর্মেই কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কট্টর স্বভাবের জন্য ঝামেলা লাগে। আমার কাছে পেট আগে, মানুষ বাঁচলে তো ধর্ম! যদি মানুষই না বাঁচে, তাহলে ধর্ম কীভাবে আসবে!’’
সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করতে চান কঠোর পরিশ্রমী বাবা। রাত-দিন পেরিয়ে ধুলো, বালি, রাস্তার খানাখন্দ অতিক্রম করেও তিনি চলেন নিজের মতো করেই। রাস্তাঘাটে চলে খারাপ ব্যবহারের পালা! তাঁর কথায়, ‘‘একদিন যদি কাজ না করি, ঘরে টান পড়ে যাবে, পুজোর সময় অতিরিক্ত আয় হয়। রুটি-রুজি সবার আগে দরকার।’’ কী চান? উত্তরে তিনি বলছেন, ‘‘সাধারণ মানুষের জন্য কাজ হোক। সকলের ভালো হোক।’’
