Hashtagintro

পুজোর এপার-ওপার এবং ‘বাঁশে কে উঠেছে!’

বেচার সেই কণ্ঠস্বর তুলে নিয়ে তৈরি হয়ে গেল হাজার হাজার রিল্‌স। দুর্গাপুজো মণ্ডপে বাঁশে বসার সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল তা।

চোরবাগান আমাদের সবার মনখারাপ করে দিয়েছে। অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নেব। ভুলগুলো শুধরে নেব। আর কখনও আমরা এমন দুর্ঘটনা চাই না। দুর্গাপুজোর সঙ্গে কোনও কম্প্রোমাইজ করতে পারব না। কারণ, দশপ্রহরণধারিণী হলেন বাঙালির ঘরের মেয়ে। সবাই এই সময়ের অপেক্ষায় থাকে। বাড়ি হোক বা পাড়া, একটি না একটি পুজোর সঙ্গে সব মানুষ যুক্ত থাকে। ওই ক’-দিন কাজ থেকে ছুটি, দল বেঁধে নতুন জামা পরে ঠাকুর দেখা, পাড়ার মণ্ডপে আড্ডা, ভালো-মন্দ খাওয়া, গাঁয়ের বাড়িতে ফেরা, অষ্টমীর অঞ্জলি, নবমীর মাদকতাময় নিশি, কালিম্পং-কাজা-কাশ্মীর ভ্রমণ– এসবই বাঙালির চিরন্তন স্বাধীনতা।

দুর্গাপুজোর আবহটাও বেশ। দেবী কৈলাস থেকে বাপের বাড়ি আসছেন। সঙ্গে দুই ছেলে, দুই মেয়ে। তাঁদের আগমন উপলক্ষে‌ বাপের বাড়ি বা ধরাধামে সাজ-সাজ রব। যেমন বাঙালির ঘরে হয়। মা একা আসছেন না, সঙ্গে নিয়ে আসছেন মহিষাসুরকেও। মণ্ডপে-মণ্ডপে তাকে বধ করে তিনি পূজিত হবেন। কী দারুণ ব‌্যবস্থা! বাঙালি মনপ্রাণ দিয়ে বেছে নিয়েছে এই প্রহর। উৎসব দিনে দিনে প্রসারিত হয়েছে। একটা সময় ছিল সাবেকিয়ানা, কালক্রমে যোগ হয়েছে থিম। বাড়ির পুজো থেকে থিমের দুর্গা– সবই সময়ের ফসল। পরিবর্তন মানুষের ভালো লেগেছে। বেশ চলছে সব।

কিন্তু এবারও সব যখন প্রস্তুত, তখনই নেমে এল কালো ছায়া। দেবীর বোধন হল নির্বিঘ্নে। কিন্তু সপ্তমীর উৎসবমুখর সন্ধ‌্যা সহসা রূপ নিল অন্ধকারে। খবর এল, উত্তর কলকাতার চোরবাগান পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছেন ১৯ জন মানুষ। তাঁদের গায়ে পুজোর নতুন পোশাক ছিল। প্রাণে উৎসব। কিন্তু মুহূর্তে তাঁরা এক-একটি ‘লাশ’ হয়ে গেলেন।

খবরটা পেয়ে বুকের মধ্যে যেন ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। কলকাতায় পুজোয় লক্ষ-লক্ষ মানুষের ঢল নামে। কিন্তু কখনও সমস‌্যা হয় না। মানুষ আসে দূর-দূর থেকে, আবার চলে যায়। আজকাল মহালয়ার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় ঠাকুর দেখা। ষষ্ঠী থেকে জনজোয়ার বয়ে যায় শহর জুড়ে। এটাই অভ‌্যাস। এর জন‌্য কাউকে অালাদা করে ডিসিপ্লিনের পাঠ দিতে হয় না। পুজো কমিটিগুলিও জানে কী করতে হবে। তবু কখনও কখনও ভুল হয়ে যায়। হয়ে যায় ছন্দপতন। দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। মানুষের প্রাণ যায় মানুষেরই ভুলে অথবা গাফিলতিতে। কিন্তু চোরবাগানেও অনেক বড় ভুলের মাশুল দিতে হল। বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার ঘোষণায় পড়িমরি করে পালাতে গিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি। লাশের স্তূপ দেখে আমরা শিউরে উঠি। পুজোয় আনন্দ করার মনটাই কেমন দুর্বল হয়ে যায়।

চোরবাগান অ‌‌ন‌্য শিক্ষাও দিয়ে গেল। থিম-কে শিখণ্ডী করে ভিড় টানার প্রতিযোগিতা যে ইঁদুরদৌড়ে পরিণত হয়েছে, তার জেরেই এই দুর্ঘটনা। বেশি ভিড় মানে বেশি স্পনসর, বেশি পুরস্কার, বেশি টাকা। সবাই সেদিকেই ছুটছে। মানুষ ঢুকবে কোথা দিয়ে, বেরবে কোথা দিয়ে, দিন দিন সেই ব‌্যবস্থাগুলো গৌণ হয়ে গিয়েছিল। মণ্ডপের ভিতর অাবছা অন্ধকার করা যেন ফ‌্যাশন। বহু মণ্ডপে তো আবার দেবীকে চেনাই যায় না! অসুর নিধন করার যে সাবেক মূর্তি, তা হারিয়ে গিয়েছে থিমের ঠেলায়।

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার ঘোষণায় পড়িমরি করে পালাতে গিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি। লাশের স্তূপ দেখে আমরা শিউরে উঠি। পুজোয় আনন্দ করার মনটাই কেমন দুর্বল হয়ে যায়।

কার গাফিলতিতে এমন মারাত্মক ঘটনা তার অনুসন্ধান চলছে। মুখ‌্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিহতদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ক্ষতিপূরণের চেক ও চাকরি দেওয়ার ব‌্যবস্থা করেছেন। বলেছেন, তিনি বিচার দেবেন। কাউকে আড়াল করা হবে না। নিজে এই ঘটনায় বেদনাহত। সরকার প্রাক্তন বিচারপতিকে সামনে রেখে তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। ভুল-ত্রুটি কার কতটা তা নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে। নতুন সরকার এসেছে। কাজ বুঝে নিতে তাদের সময় দিতে হবে। ক্ষমতাসীন দলকেও এই দুর্ঘটনার পর নিশ্চয়ই বুঝতে হবে ক্ষমতার পরিবর্তন মানে রাতারাতি সিস্টেমের পরিবর্তন নয়।

অস্বীকার করার নেই, রাজ্যে পালাবদলের পর, বিশেষ করে কলকাতার অনেক পুজোয় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়; যেহেতু বহু দিন আগে থেকেই কলকাতার বড়-বড় সমস্ত পুজোর রাশ তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রী-সাংসদদের হাতে ছিল, ফলে একটা শূন্যতা তৈরি হয়। অনেক সংগঠক-নেতা ভোটে হেরে যান, আবার কারও হয় জেলযাত্রা। এ কথা মানতেই হবে, এইসব পুজো সংগঠক নেতাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একটা বড় ফ্যাক্টর। তাঁরা হাতের তালুর মতো সবটা জানতেন। পাশাপাশি এ-ও ঠিক, তঁারাই এই ভিড় কাড়ার প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন। পরিবর্তনের পর তাঁরা পুজো থেকে সরে যেতে হয় বাধ্য হন, নয়তো, তাঁদের সরিয়ে দিয়ে নতুন কমিটি তৈরি হয়। নতুন পরিস্থিতিকে মানিয়ে এগনোই দস্তুর।

চোরবাগানে এত বড় বিপর্যয় হলেও সারা রাজ্যে পুজো নির্বিঘ্নেই কেটেছে। মানুষ ঘটনার শোক সামলে স্বাভাবিক হয়ে মেতেছে উৎসবে। পুজোর সময় আমাদের সবার নজর থাকে পদ্মাপারে। কী হয়, কী হয় ব‌্যাপার! অতীতে পুজোর সময় যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, মণ্ডপ পুড়িয়ে দেওয়া থেকে মূর্তি চুরমার করা, তাতে ভয় যে এবারও ছিল না তা নয়!
কিন্তু এবার মৌলবাদীদের সামনে বাধার প্রাচীর তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুধু নিরাপত্তার ব‌্যবস্থা নয়, এমন একটা পরিবেশ তিনি এবার তৈরি করেছিলেন, যাতে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় হিন্দুরা। তারা সাহস নিয়ে পথে নামে। ফলে, এবার বাংলাদেশে পুজোয় কোনও অশান্তিই হয়নি। দশমীর দিন ময়মনসিংহ, বরিশাল, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনায় হিন্দু রমণীদের উৎসবের মেজাজে সিঁদুর খেলার যে ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, তাতে সব চেয়ে যদি কেউ খুশি হয়ে থাকেন তিনি তারেক রহমান।

চোরবাগানে এত বড় বিপর্যয় হলেও সারা রাজ্যে পুজো নির্বিঘ্নেই কেটেছে। মানুষ ঘটনার শোক সামলে স্বাভাবিক হয়ে মেতেছে উৎসবে।

হাসিনা বিদায়ের পর বাংলাদেশে কোটির বেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। হিন্দুরা স্বাভাবিকভাবেই অধিকাংশই আওয়ামী লিগকে সমর্থন করত। কিন্তু ওই দল ‘নিষিদ্ধ’। জামায়াতে-র মদতে তথাকথিত মৌলবাদী ছাত্রদের হাতে দেশের ভার চলে যাওয়ায় গত দু’-বছর পুজো হয়েছে ভয়ে-ভয়েই।

এবার কিন্তু অন‌্য ছবি। ফিরে এসেছিল উৎসবের পরিবেশ। যেভাবে ঠাকুর নিয়ে শোভাযাত্রা হয়েছে, তা অভাবনীয়। আসলে তারেক শুরু থেকেই ছিলেন তৎপর। তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন: ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। পুজোর সময় টানা পাঁচ দিন ছুটি দিয়েছিলে। রংপুর, রাজশাহি থেকে ঢাকা, নিজে পুজোর সময় ঘুরেছেন হিন্দু মহল্লায়। হাসিনা হিন্দুদের প্রোটেকশন দিতেন। কিন্তু এভাবে দেশজুড়ে পুজোর সময় ঘুরে বেরানোর নজির নেই। এখানেই তারেক তাঁকে হারিয়ে দিয়েছেন। হিন্দুদের মণ্ডপে গিয়ে বলেছেন, এই দেশ অাপনাদেরও। নির্ভয়ে সবাই নিজের ধর্ম পালন করুন। নিজের অসাম্প্রদায়িক মূর্তি তুলে ধরে তারেক বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের সামনে বার্তা দিতে চেয়েছেন। পাশাপাশি জামায়েত-সহ মৌলবাদীদের তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, অশান্তি বরদাস্ত করা হবে না।

দুর্গাপুজো মণ্ডপে বাঁশে বসার সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় বেচার চিৎকার, ‘বাঁশে কে উঠেছে’। রীতিমতো শুটিং হয়েছে সেগুলি বানাতে!

এবার একটু অন‌্য কথা। পুজোর রেশ এখনও কাটেনি। বরং কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রস্তুতি বাঙালির মনে। পুজোর গান, পুজোর শারদ সংখ‌্যার সঙ্গে এবার বাজারে ছিল পুজোর সিনেমাও। ‘বহুরূপী: দ‌্য গোল্ডেন ডাকু’ থেকে ‘The একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’, ‘দেসু’ সাড়া ফেলে দিয়েছে। কিন্তু সবকিছু পিছনে ফেলে দিয়েছে বোধহয়, ‘বাঁশে কে উঠেছে’ রিল্‌স। বেচারা বেচারাম মান্না নির্বাচনে হেরেছেন। কিন্তু প্রাক্তন মন্ত্রী এবং সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের নেতার অজান্তেই বাজিমাত হয়েছে তাঁর কণ্ঠস্বরে।

বিষয়টা খুলে বলি। কিছু দিন আগে তাঁর নির্বাচনী ক্ষেত্র হরিপালে গিয়েছিলেন টলিস্টার দেব ওরফে দীপক অধিকারী। দেবকে দেখতে যথারীতি ভিড় উপচে পড়ে। মঞ্চ থেকে সেই জনজোয়ার সামলাতে রীতিমতো হিমশিম অবস্থা বেচারামের। হঠাৎ তিনি লক্ষ‌ করেন, বাঁশের বেড়া পেরিয়ে ঢুকে পড়তে চাইছে কিছু যুবক। তখনই তাঁর চিৎকার, ‘অ্যাই, ওখানে বাঁশে কে উঠেছে! দুটো থাপ্পড় মারো তো। সিসি ক্যামেরায় ছবি তোলা আছে। তোর বাড়িতে পুলিশ পাঠাচ্ছি।’ এরপর দেখা যায় হাসতে হাসতে বেচাকে সামলাচ্ছেন দেব। রাগ করতে বারণ করছেন।

এই ঘটনাক্রম সবাই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু বেচার সেই কণ্ঠস্বর তুলে নিয়ে তৈরি হয়ে গেল হাজার হাজার রিল্‌স। দুর্গাপুজো মণ্ডপে বাঁশে বসার সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল বেচার চিৎকার, ‘বাঁশে কে উঠেছে’। রীতিমতো শুটিং হয়েছে সেগুলি বানাতে! নেটদুনিয়ায় ভাইরাল। মনখারাপের মধ্যে নিখাদ বিনোদন জুগিয়েছে পুজোর এই রিল্‌স।

Source: Sangbad Pratidin Special (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Special (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language