ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত দুর্গাপুজোর পাস নিয়ে দেদার দুর্নীতি! সেই মামলায় গ্রেপ্তারির আশঙ্কায় এবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। আগাম জামিনের আবেদন জানিয়ে বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের এজলাসে মামলা দায়ের করেছিলেন তাঁর আইনজীবী। বিচারপতি সেনগুপ্ত অসুস্থ হওয়ার কারণে বর্তমানে সেই মামলা শুনছেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। এদিন মামলার শুনানিতে বিচারপতি ঘোষ বলেন, তৎকালীন সরকারের আমলে ইন্দ্রনীল সেন মন্ত্রী ছিলেন, তাই প্রভাব খাটানো তাঁর কাছে কোন কঠিন বিষয় নয়। ইউনেস্কোর নাম ভাঙিয়ে পুজোর প্রিভিউশোর টিকিট বিক্রি মামলা রাজ্যকে ফ্লো চার্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ বিচারপতির।
আদালতে ইন্দ্রনীলের আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেল পুজো প্রোমোটিংয়ের কাজ করেছেন। সে সময় তাঁর কাজ নিয়ে প্রশংসা করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেলের প্রশ্ন, “বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় নাকি?” ইন্দ্রনীল সেনের আইনজীবী বলেন, “কেউ টিকিটের দাম নিয়ে আগে অভিযোগ করেনি।” বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ প্রশ্ন করেন, “প্রিভিউ শো-এর নামে পাশ বিক্রি করা যায়? “
ইন্দ্রনীল সেনের আইনজীবী বলেন, “২৩ সালে প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রভিউ টিকিট ফ্রি ছিল। কেউ প্রতারণার অভিযোগ করতে পারবে না। এই বছরও তো প্রিভিউ শো হচ্ছে। ২০১৪-১৬ পর্যন্ত মন্ত্রী হওয়ার আগেও অনেক কাজ করেছে মাস আর্ট। টেন্ডার নিয়েছে। ৪০টি টেন্ডার নেওয়া হয়েছিল। এখন টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ করা হচ্ছে। নীতিন গডকরির সন্তানও একজন ব্যবসায়ী।” এই মর্মে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার জানিয়েছেন, প্রতি পাসে ১৭ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হত।
বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের পর্যবেক্ষণ, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে মানি ফ্লো-এর অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত তো বন্ধ করা যায় না। আপনার অ্যাকাউন্টে কোনও টাকা সরাসরি গিয়েছে? ইন্দ্রনীল সেনের আইনজীবীর দাবি, ইডি ১৯টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে কিছু পায়নি। বিচারপতির প্রশ্ন, তিনি কি বাড়তি কোন সুবিধা পায়নি? রাজ্যের মন্ত্রী যে টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রভাব খাটায়নি তা নিশ্চিত করবে কীভাবে আদালত? ইন্দ্রনীলের আইনজীবী বলেন, তাঁর মক্কেলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনও বেআইনি টাকা নেই। ইডি এক টাকাও উদ্ধার করতে পারেনি।
এই মামলায় দ্বিতীয়বার কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখের পর , ৭ অক্টোবর ব্যাঙ্ক লেনদেনের নথিপত্র নিয়ে বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ সল্টলেকের ইডি দপ্তরে পৌঁছে যান তিনি। ইডির দাবি, বেশ কিছু কাগুজে নথি ও বৈদ্যুতিন নথি দেখিয়ে ইন্দ্রনীলকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলেও তাঁর বক্তব্যে বহু অসঙ্গতি ছিল। প্রথমদিন জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি ইডিকে সহযোগিতা করেননি। সেই কারণেই ফের তাঁকে বুধবার সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দপ্তরে তলব করা হয়েছে। ইন্দ্রনীলের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন-সহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয় বৌবাজার থানায় ৷ উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর নাম ভাঁড়িয়ে দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’র পাস বিক্রি করে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তে নেমে ইডি এর আগে ইন্দ্রনীল সেনের বাড়ি, অফিস-সহ প্রায় ১৫টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছিল। সরকারি টেন্ডারের নিয়ম ভেঙে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ইন্দ্রনীল তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সংস্থাকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। ইন্দ্রনীলের মালিকাধীন সংস্থা ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩.৮ কোটি টাকারও বেশি নগদ জমা পড়েছিল। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা পাঠানো হয় বলে ইডি দাবি করে।
