যে কোনও নারীর মুখে ‘না’ শব্দটি বেরনোর অর্থ না-ই, অন্য কিছু নয়। যেমনটি দেখা গিয়েছিল অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরির ‘পিংক’ ছবিতে। সেখানেও ছিল আদালতে দাঁড়িয়ে বাদী-বিবাদী পক্ষের উকিলের যুক্তি-তর্কের লড়াই। নবজ্যোৎ গুলাতি ও বিপাশা অরবিন্দের পরিচালনায় ‘পূজা মেরি জান’ প্রায় একই কাহিনির দ্বিতীয় সংস্করণ। পূজা (ম্রুণাল ঠাকুর) এবং অঙ্কিত (বিক্রম চৌহান) এক নাট্যদলে অভিনয় করে। ‘রোমিও জুলিয়েট’ নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে মঞ্চেই অঙ্কিত পূজাকে প্রেম নিবেদন করে বসে। একটু পরেই সাজঘরে গিয়ে আবারও। কিন্তু উত্তরে সে পূজার মুখে ‘না’ শব্দটি শুনে হতবাক, হতাশ। বাড়ি ফিরে যথা নিয়মে ‘আত্মহত্যা!’
এবার অঙ্কিতকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে অভিযুক্ত হয় পূজা। আদালত ঘরে বিচার শুরু। আর এখানেই ‘পিংক’ ছবির মতো দুই উকিলে সানা (হুমা কুরেশি) ও যতীনের (বিজয় রাজ) তর্ক-প্রতিতর্কের জমাটি লড়াই ঘিরে ছবির বাকি অংশ। প্রত্যাশা মতোই পূজার বান্ধবী সানা কর্পোরেট ল-ইয়ার হয়েও যুক্তি -তর্ক এবং সাক্ষী সাবুদের সাহায্যে পূজা যে দোষী নয় সেটা প্রমাণিত হয়। এই পর্বে ছবির চিত্রনাট্য বার বার পূজা-অঙ্কিতের অতীত বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতার দৃশ্যগুলো এনেছে। ‘বন্ধুত্ব’ আর ‘প্রেম’ এক নয় সেটাই উপলব্ধি করতে চায়নি পূজার প্রেমে পাগল অঙ্কিত। বলা যেতে পারে কিছুটা টক্সিক পুরুষত্বের শিকার ছিল অঙ্কিত। এবং পূজা ক্লাসের অন্য বন্ধুদের সঙ্গেও কম ফস্টিনস্টি করেনি। ওরকমটাই যে তাঁর পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার সেটা বুঝতেই পারেনি অঙ্কিত। সে পূজার ক্ষণিক ইশারাতেই বুঁদ হয়েছে।

পরিচালক দুজন কীভাবে ধীরে ধীরে পূজার অমন ব্যবহার এবং অঙ্কিতের প্রেম নিবেদনে ‘না’ বলার ব্যাপারটাকে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলেন সেটাই চিত্রনাট্যের কারুকাজ। প্রায় চার বছর ধরে চলা সেই নাটকের মধ্যে ঢুকে পড়ে আরও কিছু ঘটনা। যেখানে বেশ কয়েকবারই পূজার কৌশলী ও স্বার্থপর চারিত্রিক দিকটা উঠে আসে। কিন্তু বন্ধুকে নিরাপরাধ প্রমাণ করতে সানা, পূজার নাটকীয় কিছু অতীত ঘটনার প্রসঙ্গ আনে এবং জয় হয় তারই। চিত্রনাট্যের এই পর্বে দর্শককে বার বার উত্তেজনার আঁচ পোহাতে দেন। এখানেই ছবিটি সফল। তবে কারও মনে হতেও পারে অঙ্কিতের প্রতি পূজার কিছু কিছু ব্যবহার ফস্টিনস্টির চাইতে কিছু বাড়তিই ছিল। সেটা কি ‘নাটক’ তৈরির জন্য?

এই ছবিতে চোখ ও মনখুলে দেখার মতো হল তিন শিল্পীর দুর্দান্ত অভিনয়। পূজার চরিত্রে ম্রুণাল ঠাকুর চিত্রনাট্যের প্রতি আস্থা রেখেই রোমান্টিক দৃশ্যে এবং নিজের অস্থিরতা প্রকাশে কোনও ত্রুটি রাখেননি। উকিল হুমা কুরেশি অনেকদিন পর স্বাভাবিক এবং সুঅভিনয়ে নজর কাড়লেন। বিজয় রাজ সু-অভিনেতা। তাঁর যতীন উকিলের চরিত্র এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ। জিষ্ণু ভট্টাচার্যের সিনেমাটোগ্রাফি এবং বিশাল মিশ্রর আবহ ছবির আরও একটি পজিটিভ দিক। কিন্তু কথা তবুও একটাই। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় কারণে-অকারণে নারীকেই দোষারোপ করা কি সত্যিই কমবে? পরিবর্তন দরকার চেতনায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে।
