ভবনের প্রতিটি ইট ইতিহাসের সাক্ষী! সময়ের দাবি মেনে কিছুটা অংশ সংস্কার হয়েছে। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের পর বেলতলা। সেখান থেকে কিছুটা এগলেই বড় উঠান। শেষে ঠাকুরদালান। যেখানে এখন প্রস্তুতি তুঙ্গে। হাতে মাত্র কয়েকঘণ্টা। ষষ্ঠীর বোধনের অপেক্ষা নয়। রানাঘাটের দে চৌধুরী বাড়ির পুজো প্রতিপদেই শুরু হবে। প্রতিপদ থেকে প্রতিদিনই হয় যজ্ঞ। দেওয়া হয় বেলপাতার আহুতি। ষষ্ঠী থেকে নবমী একটানা জ্বলে অক্ষয় প্রদীপ। এবার এই পুজো পা দিল ২৮৩ বছরে।
ব্যবসার সূত্রে নদিয়ার রানাঘাটে আসেন রামসুখ দে। চূর্ণীর ধারে গড়ে তোলেন নিজের বাড়ি। । কথিত, ব্যবসায় সাফল্য এবং দানধ্যানের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে চৌধুরী উপাধিতে ভূষিত করে। সেই থেকেই দে চৌধুরী পরিবারের পরিচিতি। সালটা ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দ। বাড়িতে শুরু করেন দেবী দুর্গার আরাধনা।

এই বাড়িতে প্রতিপদ থেকেই শুরু মূল আচার। চলতি বছর রবিবারে হবে মণ্ডপে ঘট স্থাপন। প্রতিদিন সকালে চলে দেবীর আবাহন ও যজ্ঞ। প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত মোট ১০০৮টি বেলপাতা আহুতি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। নবমীর দিন আহুতি দিয়ে যজ্ঞ শেষ হয়। পাশাপাশি, ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত একটানা জ্বালিয়ে রাখা হয় প্রদীপ। নির্দিষ্ট স্থানে জ্বলে থাকা সেই প্রদীপ নেভানো হয় না। এই সমস্ত আচারই পরিবারের কাছে পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য রক্ষার অঙ্গ।
দে চৌধুরী বাড়িতে পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। এখানে বলিদানের রীতি নেই। পুজোর দিনগুলিতে পরিবারের সদস্যদের আহারেও থাকে নিরামিষের নিয়ম। দেবীকে রান্না করা ভোগের পরিবর্তে দেওয়া হয় কাঁচা ভোগ। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে এই নিবেদন। নবমীর দিন সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা করে রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। তবে সেই খাবার দেবীকে নিবেদিত ভোগের অংশ নয়। পরিবারের সদস্য অমরনাথ দে চৌধুরী জানান, “মাকে কাঁচা ভোগ দেওয়ার পরম্পরা চলে আসছে। সাধারণ মানুষের জন্য নবমীতে যে খাবারের আয়োজন করা হয়, তা আলাদা করে তৈরি করা হয়।”

দে চৌধুরী বাড়ি শুধু ঐতিহ্য রক্ষার পুজো নয়। মিলনক্ষেত্রও বটে। দেশ-বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও পুজোর সময় বাড়িতে ফিরে আসেন। পরিবারের সদস্যদের মিলন, পুরনো স্মৃতিচারণ এবং রীতিনীতি পালনের মধ্য দিয়েই সম্পূর্ণ হয় পুজোর উৎসব।
