ছোট থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল ছেলেটা। সেই স্বপ্নকে সত্যি করতে লড়াই করেছে গোটা পরিবার। পাশে থেকেছেন কোচ। তাঁর রিষড়া জুভেনাইল কোচিং সেন্টারের মাঠে ফুটবলের প্রাথমিক পাঠ নিয়ে আজ সে দেশের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে। এ লেখার বিষয় সৌম্যজিৎ সরকার। নামটা এতদিন সামনে আসেনি। আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করার পর লাইমলাইটে সে।
অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছে ভারত। আজারবাইজানের বাকুর হোভসান কম্পিটিশন কমপ্লেক্সে লাওসকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের ‘ব্লু কল্টস’। ভারতের হয়ে জোড়া গোল আর লালরেমরুতফেলার। একটি করে গোল ম্যাকডোনিশ এনগাইরাংবাম এবং সৌম্যজিৎ সরকারের। এই গোলটাই নতুন করে আলোয় নিয়ে এল শ্রীরামপুরের সাতঘরা পূর্বপাড়ার এক কিশোর ফুটবলপ্রতিভাকে।
২০২২ সালে বিধাননগর মিউনিসিপ্যাল স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়া, ২০২৪ সালে এফসি মাদ্রাজে সুযোগ পাওয়া, আর ২০২৬ সালে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলে জায়গা করে নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আজারবাইজান পাড়ি।
২০২২ সালে বিধাননগর মিউনিসিপ্যাল স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়া, ২০২৪ সালে এফসি মাদ্রাজে সুযোগ পাওয়া, আর ২০২৬ সালে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলে জায়গা করে নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আজারবাইজান পাড়ি। সৌম্যজিতের এই যাত্রাপথের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে পরিশ্রম আর নাছোড় মানসিকতা। সৌম্যজিতের ফুটবলার হয়ে ওঠার কাহিনির শুরু রিষড়া জুভেনাইল কোচিং সেন্টারে। শান্তনু দেব ওরফে নাড়ুদার হাত ধরে। সেখান থেকেই নাড়ুদা তাকে নিয়ে আসে বিধাননগর মিউনিসিপ্যাল স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে। সেই থেকেই যাত্রা শুরু বৈশাখী মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে। পরে সুযোগ পায় অ্যাকাডেমির অনূর্ধ্ব-১৩ দলে। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের প্রতিভার পরিচয় দেয় সৌম্যজিৎ।
২০২৩ সালে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সাব-জুনিয়র লিগের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে অ্যাকাডেমি। দল যায় ওড়িশায়। সেখানে এফসি মাদ্রাজের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ ১-১ গোলে শেষ হয়। সেই ম্যাচেই সৌম্যজিতের খেলা নজর কাড়ে এফসি মাদ্রাজের কর্তাদের। পরের বছরই নতুন দলের জার্সিতে দেখা যায় তাকে। অ্যাকাডেমির হয়ে বিভিন্ন ম্যাচে সৌম্যজিতের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। তার শেখার আগ্রহ প্রবল। পাশাপাশি পরিশ্রম করার ক্ষমতাও মুগ্ধ করেছিল কোচদের। রিষড়ার মাঠে ফুটবলের প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার পরে এফসি মাদ্রাজে আরও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় সে। সেখানেই নিজেকে আরও পরিণত করে জাতীয় দলে সুযোগ পায় সৌম্যজিৎ।
অ্যাকাডেমির হয়ে বিভিন্ন ম্যাচে সৌম্যজিতের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। তার শেখার আগ্রহ প্রবল। পাশাপাশি পরিশ্রম করার ক্ষমতাও মুগ্ধ করেছিল কোচদের।
এফসি মাদ্রাজের কর্তাদের অবদানের কথাও স্মরণ করছে তার পুরনো অ্যাকাডেমি। প্রতিভা চিনে নিয়ে সৌম্যজিৎকে বড় মঞ্চে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাঁরা। সৌম্যর সাফল্যে গর্বিত তার বাবা-মা। সৌম্যজিতের বাবা পাঁচুগোপাল সরকার একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। ছেলের সাফল্যে আপ্লুত তিনি। বললেন, “নাড়ুদার মাঠে ছেলেকে প্রথম নিয়ে যায় ওর মা। পাঁচ বছর আগে। সৌম্যর বয়স তখন ১১ হবে। বাবা হিসাবে খুবই খুশি। গর্বিত। ওকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তার ফল পেল আজ। ও আরও ভালো খেলুক। ভবিষ্যতে বড় ক্লাবে সুযোগ পাক। এটাই চাইব।”
ছোটবেলায় ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচে ম্যাসকট হিসাবেও মাঠে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সৌম্যজিতের। ফুটবলারদের হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করেছিল সে। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, এক দিন দেশের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামবে সেই ছোট্ট ছেলে। মা পুষ্পাঞ্জলি সরকারের কথায় ধরা পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের দীর্ঘ লড়াইয়ের ছবি। বললেন, “আমরা বিরাট ধনী পরিবারের নই। মধ্যবিত্ত পরিবারের। ছোট থেকে যে কষ্ট করেছে, তার প্রতিদান পেল। ও যেখানে যেখানে গিয়েছে, বাধা দিইনি। অনেক কষ্ট করে অর্থ জোগাড় করেছি এর জন্য। হাল ছেড়ে দিইনি। ও যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। ওর পাশে থেকেছি।”
লাওসের বিরুদ্ধে দেশের জার্সিতে গোল করার পরে ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে মায়ের। পুষ্পাঞ্জলি জানালেন, “ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘ভারতীয় দলের খেলোয়াড় হয়ে বিশ্বকাপে যে গোল দিলি, তাতে তোর কেমন লাগছে?’ উত্তরে জানায়, ‘খুবই ভালো লেগেছে। তবে আগামী দিনে যাতে আরও ভালো করে খেলতে পারি, সেই চেষ্টাই করব। দেশের নাম যাতে আরও উজ্জ্বল করতে পারি’।” ছোট থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখত সৌম্যজিৎ। সেই স্বপ্নপূরণের পথে পড়াশোনাকেও চালিয়ে যাচ্ছে সে। আপাতত নবম শ্রেণিতে ওপেন স্কুলিংয়ের মাধ্যমে পড়াশোনা করছে তরুণ ফুটবলার।
ছোটবেলায় ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচে ম্যাসকট হিসাবেও মাঠে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সৌম্যজিতের। ফুটবলারদের হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করেছিল সে। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, এক দিন দেশের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামবে সেই ছোট্ট ছেলে।
রিষড়া জুভেনাইল কোচিং সেন্টারের কোচ নাড়ুদাও সৌম্যজিতের সাফল্যে খুশি। ৭০ বছর বয়সি এই কোচ ২০০২ সাল থেকে ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাঁর কোচিং থেকে উঠে এসেছেন সৌভিক বিশ্বাস, সৌরভ দাসের মতো ফুটবলারও। রিষড়ার ফুটবল ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সুধীর কর্মকার ও শিশির ঘোষের মতো দুই কিংবদন্তির নাম। এবার কি তবে সৌম্যজিতের পালা? এতটা তাড়াতাড়ি সেকথা বলার সময় আসেনি। কোচের কথায়, “ও আমাদের গর্ব। তবে এটুকুতে মন ভরবে না। চাই আরও বড় জায়গায় যাক। ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাই যায়।”
সেই স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে সৌম্যজিৎ। লাওসের বিরুদ্ধে ভারতের জয়ের ম্যাচে দুরন্ত গোল করেছে সে। প্রায় মাঝমাঠের কাছ থেকে তাঁর নেওয়া শট লাওসের গোলরক্ষককে টপকে জালে ঢুকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি ফুটবলার হিসাবে কীর্তি স্থাপন করেছে সে। পাশাপাশি তৃতীয় গোলের ক্ষেত্রে অ্যাসিস্টও করেছে। সিনিয়র ভারতীয় দলে বাঙালি ফুটবলারের উপস্থিতি নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন সৌম্যজিতের মতো তরুণ প্রতিভার উত্থান নতুন আশার আলো দেখায়।
