মাতৃযান প্রকল্পের বিল জমায় বড়সড় অনিয়ম! অস্তিত্বহীন প্রসূতির নামে সরকারি ভাউচার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার তদন্তে ৮ সদস্যের কমিটি গড়ল কল্যাণী জেএনএম হাসপাতাল। জানা গিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া প্রসূতির নামেও অ্যাম্বুল্যান্সের বিল জমা পড়েছে।
গর্ভবতী মা ও প্রসূতিদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা মাতৃযান প্রকল্প। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল। রাজ্যে পালাবদলের পর সেই মাতৃযান প্রকল্পের বিল জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এবার বড়সড় অনিয়মের অভিযোগ উঠল কল্যাণী কলেজ অফ মেডিসিন অ্যান্ড জেএনএম হাসপাতালে। অভিযোগ, এমন একাধিক প্রসূতির নামে বিল জমা পড়েছে, যাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা প্রসবের কোনও রেকর্ডই নেই। বিষয়টি নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্তে গঠন করা হয়েছে আট সদস্যের একটি কমিটি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি হাসপাতালের সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ধ্রুবজ্যোতি সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর মাতৃযান প্রকল্পের বিল সংক্রান্ত বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। দেখা যায়, এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ভেন্ডাররা দীর্ঘদিন ধরে কোনও বিল জমা দিচ্ছেন না। প্রায় দেড় বছর ধরে বিল জমা না পড়ার বিষয়টি প্রথমে হাসপাতাল সুপারের নজরে আসে। এরপর প্রায় ছয় মাস আগে সংশ্লিষ্ট ভেন্ডারদের চিঠি দিয়ে বকেয়া বিল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ৩০ জুলাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফের তাঁদের বিল জমা দেওয়ার কথা জানান। এরপর বেশ কিছুদিনের মধ্যে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক বিল জমা পড়ে। আর সেই বিলের কয়েকটি প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করতে গিয়েই সামনে আসে একাধিক অসঙ্গতি। অভিযোগ, যে সমস্ত প্রসূতির নামে মাতৃযানের ভাড়া বাবদ সরকারি ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকেই নাকি ওই হাসপাতালে কখনও আসেননি। এমনকি তাঁদের নামে হাসপাতালে প্রসবের কোনও নথিও পাওয়া যায়নি। অথচ তাঁদের নামেই জমা পড়েছে সরকারি অর্থের দাবি সংক্রান্ত ভাউচার।
শুধু তাই নয়, মাতৃযানের ভাড়ার ক্ষেত্রে দূরত্ব বা কিলোমিটার হিসাবেও একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকার প্রসূতিদের ক্ষেত্রেও অনেক বেশি দূরত্ব দেখিয়ে বিল জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃত দূরত্বের সঙ্গে ভাউচারে উল্লেখ করা কিলোমিটারের মিল রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই প্রকল্পের সঙ্গে মোট সাতজন ভেন্ডার যুক্ত ছিলেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের জমা দেওয়া বিল খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ভেন্ডারদের সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স বা মাতৃযান পরিষেবা পরিচালনার বৈধ অনুমতি ছিল কি না, সেই সংক্রান্ত নথিও চেয়ে পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ইতিমধ্যেই আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালের অ্যাকাউন্টস অফিসারকে কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিল সংক্রান্ত কাজে যুক্ত সিস্টার ইনচার্জদেরও কমিটিতে রাখা হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাসপাতাল সুপার।
অন্যদিকে, বিষয়টি ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য দপ্তরকে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কল্যাণী বিধানসভার বিধায়ক অনুপম বিশ্বাস এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকারও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, হাসপাতালের মধ্যে কোনও দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতাল সুপার ধ্রুবজ্যোতি সরকার জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর এই বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। এরপরই তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন। তাঁর কথায়, কল্যাণী কলেজ অফ মেডিসিন অ্যান্ড জেএনএম হাসপাতালকে ঘিরে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু মাতৃযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরিষেবার বিলের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনার শিকড় আরও গভীরে রয়েছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আগামী ৫ নভেম্বর তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে, কারা এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত এবং কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রসূতি মা ও নবজাতকের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত মাতৃযান পরিষেবা। সেই পরিষেবার বিলেই যদি ভুয়ো তথ্য বা অস্তিত্বহীন উপভোক্তার নাম উঠে আসে, তাহলে সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা ও পরিষেবার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। এখন নজর ৫ নভেম্বরের তদন্ত রিপোর্টের দিকে।