আন্দোলনের সাফল্য কি শুধুই একটি রাজনৈতিক স্লোগানে আটকে? নাকি মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণা ও বৃহত্তর উদ্বেগকে ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি? ‘ইন্ডি’ জোটের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে এই প্রশ্নই নতুন করে সামনে আসছে। এক সময় ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ এবং ‘সংবিধান খতরে মে হ্যায়’ স্লোগানকে হাতিয়ার করে ঘুরে দাঁড়ানোর জমি খুঁজে পেয়েছিল কংগ্রেস। এবার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডি জোটের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র ‘ভোট চুরি’। কিন্তু সেই ইস্যুতে এখনও প্রত্যাশিত সাফল্য অধরা। এই আন্দোলন কেন সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারছে না, তা নিয়ে জোটের অন্দরেই রয়েছে প্রশ্ন। তাই সিপিএম মনে করছে, শুধু ভোট চুরি নয়, সঙ্গে সংবিধান, শিক্ষা, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মতো বিষয়গুলি আন্দোলনের ইস্যু করতে পারলে সবস্তরের মানুষের মনে দাগ কাটা সম্ভব হবে। সর্বপরি অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো ‘বুনিয়াদি তত্ত্ব’কে হাতিয়ার করতে না পারলে ভোটারের মন পাওয়া যাবে না। এই নিয়ে ‘ইন্ডি’ জোটের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন দলের নেতারা।
‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ কিংবা সংবিধান বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা—এই দুই স্লোগান দেশের অনেক মানুষের মনে আলোড়ন তুলতে পেরেছিল। কারণ, তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দেশের ঐক্য, গণতন্ত্র, অধিকার এবং সংবিধানের মতো বৃহত্তর প্রশ্ন। সাফল্য পেয়েছিল কংগ্রেস-সহ ইন্ডিয়া জোটের সব শরিক। লোকসভায় কংগ্রেস একাই শক্তি দ্বিগুণ করেছিল। কিন্তু ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ এখনও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছতে পারেনি। ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যাঁদের নাম তালিকায় রয়েছে, তাঁদের বড় অংশের মধ্যে এই ইস্যু নিয়ে তেমন উদ্বেগ তৈরি হয়নি। ফলে আন্দোলনের পরিসরও একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে আটকে যাচ্ছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের। এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে বিজেপি, এমনটাই মনে করছে ইন্ডি জোটের শরিক বামেরা। কংগ্রেস যখনই ভোট চুরির অভিযোগে সরব হচ্ছে, তখনই পালটা আক্রমণে নেমে পড়ছে গেরুয়া শিবির। বিরোধীদের আন্দোলনকে একটি নির্দিষ্ট ইস্যুর গণ্ডিতে আটকে রাখাই তাদের কৌশল বলে মনে করছে সিপিএম। তাতে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, কৃষক সমস্যা, শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা কিংবা অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইন্ডি জোটের শরিক সিপিএম।
দলের পলিটব্যুরোর বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য় সুজন চক্রবর্তীর মতে, ভোট চুরির বিরুদ্ধে আন্দোলন অবশ্যই চলবে। কিন্তু সেই আন্দোলনকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত জনসমর্থন মিলবে না। শুধু ভোটার তালিকার কারচুপি নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণার প্রশ্নগুলিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনতে হবে।’’ সূত্রের খবর, সেই লক্ষ্যেই কংগ্রেস-সহ ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলিকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেবে সিপিএম। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট ইস্যুর প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের সামগ্রিক সমস্যাকে সামনে রেখে যৌথ আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করতে চাইছে বামেরা।
রাজনীতির ময়দানে স্লোগান কখনও ঢেউ তোলে, কখনও আবার সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। ‘ইন্ডি’ জোটের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, ‘ভোট চুরি’র অভিযোগকে জনজীবনের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা। আর সিপিএমের কাছে চ্যালেঞ্জ, ইন্ডিয়া জোটকে সেই আন্দোলনের পথে ফেরানো। শেষ পর্যন্ত স্লোগানের জোরে নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে কতটা সংযোগ তৈরি করা গেল, তার উপরেই নির্ভর করবে বিরোধী রাজনীতির আগামী পথ, এমনই মনে করছেন কমরেডকুলের নেতারা।