পিতৃপক্ষেই মায়ের বোধন। মহালয়ার ৫ দিন আগেই দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেল পুরুলিয়ার পঞ্চকোট রাজপরিবারে। রবিবার। তখন ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯ টা ১৬। রাজরাজেশ্বরী ঠাকুরদালানে শিখরবাসিনী দুর্গার চরণে শুরু হল মন্ত্রপাঠ। “ওঁ চন্দ্রবসতম কলিতম নিভম চারুচন্দ্র বসতং….। ” বেজে উঠল ঢাক। শুরু হল আগমনী গান। এক এক করে চণ্ডীপাঠ, বলিদান, আরতি। কিন্তু দুর্গা ষষ্ঠীর যে বাকি আরও ১১ দিন! আসলে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নীর ধারনগরের প্রথা মেনে জিতা অষ্টমীর পরের দিন আর্দ্রা নক্ষত্র যুক্ত কৃষ্ণ পক্ষের নবমীতে এই পুজো হয়ে আসছে শকাব্দ ২ থেকে। প্রায় দু’হাজারেরও বেশি বছর আগে। ১৬ দিনের এই পুজো ষোল কল্পের দুর্গাপুজো নামে পরিচিত।
এই পুজোয় মায়ের মন্ত্র গুপ্ত। গুপ্ত মায়ের আসন। এমনকি ভোগও। পূজার মন্ত্র এতটাই গোপনীয় যে আজও কোনও লিপি প্রকাশ হয়নি। এমনকি কোথাও কোনও কাগজ, খাতা, ডাইরিতেও লেখা নেই। গাছের ছালে সংস্কৃত ও পালি ভাষায় ৯ টি পাতায় ৯ টি লাইন লেখা। তন্ত্র বিরাচার মতে হয় পুজো। এই রাজপরিবারে অভিশাপ রয়েছে ওই গুপ্ত মন্ত্র সংরক্ষণ করতে গেলে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। হাতেনাতে তার ফল পেয়েছে ওই রাজপরিবারের পুরোহিতের পরিবার।
মা শিখরবাসিনী দুর্গা এখানে অষ্টধাতুর তৈরি। চতুর্ভুজা। পঞ্চকোট রাজপরিবারের সদস্য তথা সিপাহী বিদ্রোহের মূল উদ্যোক্তা মহারাজাধিরাজ নীলমনি সিং দেও-র প্রপৌত্র সৌমেশ্বরলাল সিং-দেও বলেন, “নিত্যপুজোতে মা অধিষ্ঠান করেন তাঁর ঐতিহ্যশালী বেদিতে। মার্বেল পাথরের একটি বড় সিংহাসনের ওপরে একটি রুপোর সিংহাসনের মাঝে সোনার সিংহাসনের মাথায়। আর মহাসপ্তমীর দিন অর্ধরাত্রি বিহীত পুজোর পর্বে দশমীর পূর্বাহ্ন পর্যন্ত মাকে গুপ্ত আসনে বসানো হয়।”
মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নীর ধারনগরের মহারাজা বিক্রমাদিত্যের বংশধর জগদ্দেও সিং দেও-র কনিষ্ঠ পুত্র দামোদর শেখর সিং দেও বাহাদুর চাকলা পঞ্চকোটরাজের প্রতিষ্ঠাতা। এই রাজস্থাপনের সময় থেকেই তার পূর্বপুরুষ কুলপ্রথা অনুযায়ী এই পুজো শুরু হয়। রাবণবধ করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র দুর্গাদেবীর আরাধনার সূচনার্থে যে ‘বোধন’ করেছিলেন, তা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। সেই মত অনুসারেই মহারাজা দামোদরশেখর সিং দেও বাহাদুর এই জঙ্গলমহলে দুর্গাপুজো শুরু করেন।
দামোদর শেখরের নামানুসারে এই বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহলের নাম ‘শেখরভূম’ বা ‘শিখরভূম’ নামকরণ হয়। তাই এই দুর্গার নামও হয় শিখরবাসিনী দুর্গা। বর্তমানে পঞ্চকোট রাজ দেবোত্তর-র সেবাইত বিশ্বজিৎপ্রসাদ সিং দেও-র তত্ত্বাবধানে এই পুজো হয়। যে বনমালী পণ্ডিতের হাত ধরে এই পুজো হয় তাঁদের বংশধর বর্তমানে গৌতম চক্রবর্তী এই পুজো করে থাকেন। তাঁর কথায়, “৮৩ তম পুরুষ ধরে এই গুপ্ত মন্ত্রে মায়ের পূজা পাঠ চলছে। যে ভূর্জ পত্র বা গাছের ছালে এই মন্ত্র লেখা রয়েছে তার অবস্থা এতটাই করুন যে হাত দিলেই ঝুর ঝুর করে পড়তে শুরু করে। ওই ভূর্জ পত্র বিশেষ দিনে নিয়ে এসে মায়ের চরণে রেখে দিই। ওই গুপ্ত মন্ত্র আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। তাই আর চোখে দেখতে হয় না।” নিত্যপুজো থেকে এই ১৬ কল্পের পুজোর গুপ্ত ভোগ রাঁধেন সুদেব দেওঘরিয়া। তিনি বলেন, “নিত্য পুজোয় মাকে ল্যাটা মাছ দিতে হয়। একটা ল্যাটা মাছ লাগবেই। না হলে রাজপরিবারকে উপোস দিতে হবে। গুপ্ত ভোগ সেবাইত ছাড়া কেউ গ্রহণ করতে পারবেন না।”
