Hashtagintro

মৌচাকে ঢিল ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’! কেমন হল সৃজিতের শারদ উপহার?

এই ছবিতে (Emperor vs Sarat Chandra) এক অনন্য কাণ্ড ঘটিয়েছে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ব্রিলিয়ান্ট প্রতিভা। স্রষ্টা শরৎচন্দ্র এবং তাঁর বিস্ফোরক, ভুবনকাঁপানো, ইংরেজ-চাবকানো সৃজন ‘পথের দাবী’-কে এক সুতোয় অঙ্গাঙ্গী বুনে দিয়েছে সৃজিত! চিত্রনাট্যে ঘটিয়েছে ইথার স্তরের মিরাক্‌ল : কোথাও পড়েনি সেলাইয়ের দাগ! সমস্ত ছবি জুড়ে সে এনেছে সালভাদোর দালির ছবির দ্রবতা। শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর শোচনা ও স্বপ্ন, ইংরেজ শাসিত ভারতের লাঞ্ছনা, অপমান, দলন ও দুঃখের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের উদাসীনতা এবং ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে তাঁর আকস্মিক জাগৃতি, তাঁর হৃদয়ের গর্জন, তাঁর বিপন্ন আর্তি, এবং এই উপন্যাসের নায়ক সব্যসাচী মল্লিকের মতো এক প্রবল সাহসী, মেধাবী, রোমান্টিক সৃজন : এই সমস্ত আপাত বিরোধাভাস গলে যাচ্ছে পরস্পরের মধ্যে আশ্চর্য সাবলীলতায়! কখনও মীড়ে।

কখনও ঝালায় এবং সৃজিত আমাদের নাগালে এই প্রথম নিয়ে আসছে এমন এক শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে যাঁদের আমরা, অধিকাংশ বাঙালি, আগে এই আলোয় দেখিনি, চিনতে চাইনি, ভাবতে পারিনি। সৃজিতের ছবির নায়ক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এবং প্রতিনায়ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এবং এই ছবির আন্তর বিষয়, এক অর্থে, রবীন্দ্রর কাছে শরতের আর্ত আবেদন এবং রবীন্দ্রর শান্ত চর্চিত উদাসীনতা এবং পাতালছায়াময় স্বার্থবাদ। মাথার ওপর দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মৌচাকে ঢিল মেরেছে সৃজিত। লুকানো ইতিহাসের গায়ে তার অব্যর্থ সার্জিক্যাল স্ট্রাইক! আমার ৮৫ বছর বয়েসে, কম্পমান পায়ে লাঠি ধরে সৃজিতকে স্যালুট, এই ছবিতে দুই বিশ্বজয়ী বাঙালি সাহিত্যিকের দুটি নেপথ্যচারী পত্র শারদ উপহার করে বাঙালির সামনে আনার জন্য।

ছবির একটি দৃশ্যে শরৎচন্দ্র কাঁদছেন। তাঁর রবীন্দ্রস্বপ্ন চুরমার হওয়ার জন্য। ঠিক যেন শারদ ভোরে আকাশ থেকে ঝরেপড়া শিশির তাঁর অশ্রু। কবি ইয়েটসের ভাষায়, ভোর আকাশের ঘোমটা থেকে ঝরে পড়া সেই কান্না, যার কোনও শব্দ নেই ! সৃজিত ভাবতে পেরেছে এমন একটি দৃশ্য নদীর ধারে! সমস্ত ছবি জুড়ে, সব অ্যাকশন, দ্রোহ, গোলাগুলি, রহস্য, পৃথিবীময় নায়কের ঘুরে বেড়ানো, বিচিত্র ভাষায় তার সংলাপ ও সমাজদর্শিতা, এই অপার আন্তর্জাতিকতা ছাপিয়ে এই ছবির ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া ফ্রয়েডীয় তারল্য। আমি অবাক! বাঙালির মননে এই ছবি প্রবাহিত থাকবে। নিভে যাবে না। বিতত হতেই থাকবে বিতর্ক। অন্তত আমার মনে তো বটেই।

এই ছবির নায়ক যেহেতু শরৎচন্দ্র, তাঁর ভূমিকায় টোটা রায়চৌধুরির অভিনয়ে প্রথমেই আসছি। এবং সরাসরি লিখছি সেই বাক্যটি, যা রবিন হুডের তিরের মত বিঁধবে চাঁদমারির সেন্টারে। টোটা অভিনয় করেনি। সে হয়ে উঠেছে শরৎচন্দ্র। অননুকরণীয় আইকনের সব ভঙ্গি, কিছু মুদ্রাদোষ, বাচনবিভঙ্গ, ঈষৎ খঞ্জতা চলনে, এমনকী, রবীন্দ্রনাথের সামনেও টেবিল চাপড়ে সৎ উত্তেজনা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ এবং রবীন্দ্রস্বপ্ন ভঙ্গের অভিমান ও বেদনা : এই সব কিছুর প্রকাশে টোটা অন্তত আমার বাকি জীবনের শরৎচন্দ্র! এবং শরতের উদাসীনতা : শরৎ এক জায়গায় আত্মগ্লানিতে বলছেন, ‘দেশ যখন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে আলোড়িত, আমি তখন মদের নেশায় ডুবে লিখলাম দেবদাস। যখন দেশ কেঁপে উঠল জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংসতায়, আমি তখন শ্রীকান্তর রয়েলটি নিচ্ছি।

Srijit Mukherji’s Emperor vs Sarat Chandra movie review

আর আমি উদাসীন গাঙচিল হয়ে সুদূর আকাশে উড়তে থাকব না।’ টোটা শরতের এই উদাসীনতা ও অঙ্গীকার কী অব্যর্থ উচ্চারণে ও শরীরভাষায় ধরেছে! জড়িয়ে রেখেছে স্বভাবে! তামাকসেবক শরতের খুকখুকে কাশির মতন! টোটার পরেই আমার যাওয়া উচিত আবির চট্টোপাধ্যায় প্রসঙ্গে। কেননা সে-ই তো ‘পথের দাবী’র নায়ক, সব্যসাচী, শরতের অল্টারইগো। কিন্তু আমি যাচ্ছি রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় সঞ্জয় নাগে। এই ছবির রবীন্দ্রনাথকে বাঙালি চিনতে চায় না, জানতে চায় না। এই রবীন্দ্রনাথ জয় গোস্বামীর কণ্ঠে কথা বলেছেন। এবং ক্রমশ হয়ে উঠেছেন, শরতের সৎ আবেগ তাড়নার সামনে, প্রতিতুলনায়, মাপা জ্যামিতিক শৈত্যে ভয়ংকর। তবু সত্য। এবং আরও একবার কুর্নিশ জানাই সৃজিতকে এই রবীন্দ্রর সঙ্গে বাঙালির পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।

এবার সব্যসাচী আবির প্রসঙ্গ। প্রথমেই বলি, ৫১ বছর আগে পীযূষ বসু ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে সব্যসাচী নামে একটা ‘যাত্রা’ ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। এবং সব্যসাচীর ভূমিকায় ছিলেন উত্তমকুমার। অভিনন্দন আবিরকে সেই ছবি-যাত্রার সব্যসাচী বিন্দুমাত্র ছায়া ফেলেনি তার সব্যসাচীতে। আবিরের সব্যসাচী উত্তমমুক্ত। তার কারণ, পীযূষের জুস এক ফোঁটাও গড়িয়ে আসেনি সৃজিতের স্ক্রিপ্টে। শরৎচন্দ্র ঠিক যেভাবে ভেবেছিলেন তাঁর আন্তর্জাতিক দ্রোহী, বিপুল মেধাবী, অপূর্ব আকর্ষণীয়, নির্মমে সুন্দরে সাবলীল সব্যসাচীকে আবির আনতে পেরেছে সেই অসম্ভবের কাছাকাছি।

Emperor vs Sarat Chandra offers a fresh take on Pather Dabi

আবির ভক্তরা নতুন আবির পাবেন। এবং ভালোবেসে ফেলবেন। আবিরের পরেই আসতে হয় আমার দুর্বলতায়। বয়েসের এত বিশাল ‘hiatus’, পাণ্ডুলিপিতে ছেদের মতো। তবু মিমিমুগ্ধ আমি। আলাপে যাইনি কখনও। শরৎচন্দ্রের সুমিত্রার সঙ্গে আর কোনও নায়িকার সাযুজ্য নেই। সুমিত্রার মতো নায়িকা, রোমান্টিক দ্রোহিণী বিশ্বসাহিত্যে বিরল। সেই ভূমিকায় মিমি, ড্রাগপেডলার থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী। সন্ত্রাসবাদী সুন্দরী। এবং তার সঙ্গে চাপা ভালোবাসা সব্যসাচীর। আবিরের সঙ্গে সোহাগে খুব মানায় মিমিকে। কষ্ট হলেও সুন্দরকে সুন্দর বলতেই হয়ে আমাকে। অন্য এক নারীচরিত্র ভারতী শান্ত স্নিগ্ধ আটপৌরে, মিমির ‘ফয়েল’! ভূমিকায় দিব্যাণী চমৎকার।

Srijit Mukherji’s film explores Sarat Chandra Chattopadhyay’s literary legacy

ভারতীর প্রেমিক অপূর্ব। কিছুটা দুর্বল বিদ্রোহী। অপূর্বর ভূমিকায় ঋক, দু-একটি দৃশ্যে মনে রাখার মতো ভালো। কাঞ্চন মল্লিক, পুলিশ অফিসার। একটা একটা করে অপূর্বর নখ উপড়ে নিতে চায়। দেখবেন সেই দৃশ্যে কাঞ্চনকে। ঠান্ডা অভিনয়কে নির্মমতার কোন স্কেলে নিয়ে যাওয়া যায়, দেখিয়ে দিয়েছে কাঞ্চন। সব শেষে চন্দ্রমুখী–পিয়ারিবাই। শরৎচন্দ্র যে ছবির নায়ক সে ছবিতে পিয়ারি তো আসবেই। কিন্তু আসল চমক, ভূমিকায় বাইজিগানে সুদর্শনা গায়িকা কৌশানী। এই দৃশ্য স্পর্শময় অনুনয়ের। আর শেষদৃশ্যের দারুণ চমকের কথা না-ই বললাম!

Source: Sangbad Pratidin Entertainment (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Entertainment (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language