আপাতদৃষ্টিতে যা কিছু পরস্পরবিরোধী বিষয়, সেসবের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান, এবং সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল মনোযোগ, মোদি-শাসিত ভারতের বৈশিষ্ট্য। লিখছেন, স্বপন দাশগুপ্ত (অর্থমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার)।
ভারতে, একজন রাজনেতার পক্ষে, নিরন্তর জনসমর্থন ও স্বীকৃতি ধরে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। এখানে গণতন্ত্রের চরিত্রটি যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভরা! ফলে অনবরত প্রতিতুলনা চলে আসে। যেমন, জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির অহরহ তুলনা করা হয়— প্রধানমন্ত্রিত্বের কার্যকালাপ ঘিরে। প্রথম দু’জন লম্বা সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এঁদের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিত্ব ও শাসনপর্বের সাদৃশ্য টানার বিষয়টি — দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারী রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে বেশ আকর্ষণের হলেও— স্বতন্ত্র প্রেক্ষাপটে সেই বিশ্লেষণকে চালিত করাও যে আমাদের কর্তব্য।
প্রথমে ‘লম্বা সময়’ বিষয়টি নিয়ে ভাবি। দেখুন, ক্ষমতায় অনেক দিন থাকলেই যে সবসময় অর্থবহ প্রভাব তৈরি করা যায়, এমন কিন্তু নয়। যেমন, ১৭১৯ থেকে ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত, প্রায় ৪৯ বছর, মহম্মদ শাহ ‘রঙ্গিলা’ মুঘল সম্রাট ছিলেন। কিন্তু নামেই। প্রভাব বা তাৎপর্যে ইতিহাস তাঁকে বিশেষ মনে রাখেনি। একইভাবে দ্বিতীয় শাহ আলম ১৭৬০ থেকে ১৮০৬ সাল পর্যন্ত, ৪৬ বছর, সিংহাসনে আসীন ছিলেন। কিন্তু বরফের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া অভিযাত্রীর মতো, তিনিও, শনাক্তযোগ্য পদচিহ্ন রেখে যেতে পারেননি। নরেন্দ্র মোদি, এ যাবৎ স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কাটানো প্রধানমন্ত্রী, তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে যে ঐতিহাসিক পরিসর তৈরি করেছেন, সেটিকে কিন্তু বিলক্ষণ চিনে নেওয়া যায়— তাৎপর্যে, প্রভাবে, প্রাসঙ্গিকতায়।
২০১৪ সালে যখন দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তত দিনে পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে দু’টি মেয়াদের নড়বড়ে জোট সরকারের মতিগতি যা বোঝার তা আমরা বুঝে গিয়েছিলাম।
২০১৪ সালে যখন দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তত দিনে পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে দু’টি মেয়াদের নড়বড়ে জোট সরকারের মতিগতি যা বোঝার তা আমরা বুঝে গিয়েছিলাম। মনমোহন সিং নিঃসন্দেহে সৎ, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। স্বভাবতই নরেন্দ্র মোদির কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল বেশি। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী রূপে ১৩ বছর ধরে গুজরাটকে অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সে প্রত্যাশার পাশাপাশি এক ধরনের আশঙ্কাও কাজ করছিল। হয়তো বিজেপির একাংশের সংরক্ষণবাদী মানসিকতা মোদিকে নীরবে দুর্বল করে দেবে। বহির্বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল যে, ভারত হয়তো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ‘স্বদেশি’ গণ্ডির মধ্যে গুটিয়ে যাবে, বিশ্বায়নের গতিপ্রবাহে গা ভাসাতে পারবে না। কিন্তু তারুণ্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতার মধ্যে তিনি অনবদ্য ভারসাম্য তৈরি করলেন। কোনও পক্ষের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হল না। বিশেষত, সেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, যারা সুখে-দুঃখে সর্বদা বিজেপির পাশে ছিল, তারাও উপেক্ষিত হল না।
এই সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত ছিল— রাজনীতির প্রচলিত ভাষা ও ধারণাকে নতুন করে নির্মাণ করে তোলায়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী অথচ গভীরভাবে দেশীয় মনোভাবাপন্ন যেসব জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ভৌগোলিক সীমানায় বিচরণ করত, তাদের কাছে ‘স্বদেশি’ ধারণাটি হয়তো সে-সময় খুব আধুনিক মনে হয়নি। কিন্তু ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি জাতীয় গর্ববোধ ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে। মোদির নেতৃত্বে ভারতীয়রা সাংস্কৃতিকভাবে গর্ব বোধ করতে শুরু করে। প্রযুক্তির যা কিছু অবদান ও আশীর্বাদ তা গ্রহণ করে। হয়ে ওঠে উদ্যমী, সাহসী, কর্মঠ। ‘সংস্কার’ ও ‘জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম’— এই দুইয়ের মধ্যে যে দ্বিমুখী বিভাজন ছিল, সেই জল-অচল গণ্ডিটি ভেঙে দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ফলে ‘অন্ত্যোদয়’ ও ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে পাশাপাশি চলতে পেরেছে। ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’, ‘উজ্জ্বলা’, ‘আয়ুষ্মান ভারত’ এসব প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা প্রদানকারী ব্যবস্থা, যা জনকল্যাণ কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পূর্বতন সরকারের মতো ‘বিনামূল্যে সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি’-র বিপরীতে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উপভোক্তাদের জড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। যা কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির সরকারি প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করেছে আখেরে। এক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ‘দুগ্ধবতী গাভী’ (বা, রাজস্ব আয়ের সহজ উৎস) হিসেবে দেখা হত। কিন্তু এখন সেগুলি বিনিয়োগ-তালিকার অপরিহার্য অংশে পরিণত।
আদর্শগত মেরুকরণের উপর অতীতে যে অত্যধিক গুরুত্ব ছিল, তাকে লঘু করে দিয়েছেন। দেখানেপনা বা বাগাড়ম্বরপূর্ণ আচরণ পরিহার করেই তিনি, নিজস্ব পদ্ধতিতে, আদর্শগত স্বাতন্ত্র্যের প্রভাব কমিয়ে এনেছেন। চুম্বকে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ভারতের রাজনীতিকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
আপাতদৃষ্টিতে যা কিছু পরস্পরবিরোধী বিষয়, সেসবের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান, এবং সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল মনোযোগ, মোদি-শাসিত ভারতের বৈশিষ্ট্য। ইজরায়েল ও ইরান— উভয় দেশের সঙ্গে আমরা সম্পর্করক্ষায় সাবলীল। আবার সমগ্র আরব বিশ্বের সঙ্গে রয়েছে আমাদের বন্ধুত্ব, যা সত্যিই বিস্ময়কর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকা সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ না করেও আমরা রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান জারি রেখেছি। পশ্চিম এশিয়ায় যে রাজনৈতিক অনিশ্চয় তৈরি হয়েছে, তার নিরিখে ভারতের জ্বালানি ক্ষেত্রকে সুরক্ষিত করতে এই ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
জননীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি আরও একটি অসাধ্যসাধন করেছেন। আদর্শগত মেরুকরণের উপর অতীতে যে অত্যধিক গুরুত্ব ছিল, তাকে লঘু করে দিয়েছেন। দেখানেপনা বা বাগাড়ম্বরপূর্ণ আচরণ পরিহার করেই তিনি, নিজস্ব পদ্ধতিতে, আদর্শগত স্বাতন্ত্র্যের প্রভাব কমিয়ে এনেছেন। চুম্বকে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ভারতের রাজনীতিকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এরপরেও হয়তো তুলনা টানা হবে, তাঁর সঙ্গে অন্য অনেকের। আমাদের উত্তর অবশ্য একই থাকবে। স্বতন্ত্র প্রেক্ষাপটে সেই বিশ্লেষণকে চালিত না করলে পারলে সবই অর্থহীন!