অজয়ের তীরে কবি জয়দেবের স্মৃতিধন্য কেন্দুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাধা-বিনোদের আরাধনার দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ঐতিহ্যেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আজও বহন করে চলেছে দুর্গাপুর ফরিদপুরের ধবনি গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। কথিত ইতিহাস অনুযায়ী, আইনের কাঠগড়া পেরিয়ে এই গ্রামে এসেছিলেন রাধাগোবিন্দের বিগ্রহ। সেই বিগ্রহকে ঘিরেই আজও নিষ্ঠার সঙ্গে চলে পুজো-আচ্চা। পাশাপাশি কয়েকশো বছরের পুরনো দুর্গাপুজোও হয়ে আসছে এই পরিবারে।
অজয় নদের তীরে কবি জয়দেবের মিলন তীর্থভূমি কেন্দুলিতে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে বসে ঐতিহ্যবাহী জয়দেব-কেন্দুলির মেলা। সেখানকার জয়দেব-পদ্মাবতীর মন্দিরে শত শত বছর ধরে পুজো হয়ে আসছে রাধাবিনোদের। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগ রয়েছে ধবনি গ্রামের রাধাগোবিন্দেরও। পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, একসময় রাধাগোবিন্দের বিগ্রহ এক বছর ধবনি গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে এবং পরের বছর জয়দেব-পদ্মাবতীর মন্দিরে রেখে পুজো করা হত। কিন্তু পরবর্তীকালে মন্দিরের সেবায়েতদের একাংশ সেই ব্যবস্থায় বাধা দেন বলে অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সদস্য পেয়ারী মোহন বন্দ্যোপাধ্যায় আইনি লড়াইয়ে নামেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালতে জয় আসে তাঁরই। এরপর ফের আগের নিয়মেই এক বছর ভবানী গ্রামে এবং এক বছর জয়দেব-পদ্মাবতীর মন্দিরে রাধাগোবিন্দের বিগ্রহ রেখে পুজোর রীতি চালু হয়।
শুধু রাধাগোবিন্দের আরাধনাই নয়, এই পরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিহাসও কম প্রাচীন নয়। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, কয়েকশো বছর আগে মুখোপাধ্যায় ও বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষরা মিলিতভাবে শুরু করেছিলেন এই দুর্গাপুজো। সময়ের সঙ্গে পারিবারিক বিভাজনের কারণে সেই পুজোও ভাগ হয়ে যায়। বর্তমানে বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুখোপাধ্যায় পরিবারে পৃথকভাবে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়ে থাকে। বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোয় চার দিন ধরে চলে নানা আচার-অনুষ্ঠান। পুজোর ক’টা দিন কর্মসূত্রে দূরে থাকা পরিবারের সদস্যরাও বাড়িতে ফিরে আসেন। আত্মীয়-পরিজনের মিলনেই জমে ওঠে বাড়ির পুজো। চার দিন ধরেই থাকে অন্নকূটের আয়োজন করা হয়। দশমীর সন্ধ্যায় পার্শ্ববর্তী জলাশয়ে প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দেবীর আরাধনা। তবে এই পুজোর অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য রাধাগোবিন্দের উপস্থিতি। রাধাগোবিন্দের বিগ্রহকে সামনে রেখে এখানে দুর্গাপুজোয় কোনও ধরনের বলির প্রথা নেই। কয়েকশো বছরের ইতিহাস, আদালতের লড়াই, রাধাগোবিন্দের ঐতিহ্য এবং পারিবারিক মিলন সব মিলিয়ে ভবানী গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে বাংলার প্রাচীন পারিবারিক পুজোর এক অনন্য স্মৃতি।
