কখনও সিগারেট খাননি, অথচ ফুসফুসে ক্যানসার! শর্মিলা ঠাকুরের অসুস্থতা ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে এই প্রশ্ন। ধূমপান ছাড়াও বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান-সহ একাধিক কারণে বাড়তে পারে এই রোগের ঝুঁকি। কোন উপসর্গ দেখলে সতর্ক হবেন মহিলারা?
২০২৩ সালে এক অনুষ্ঠানে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়েছিলেন শর্মিলা। করণ জোহরের ছবি ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’-তে কাজ করতে না পারার কারণ হিসেবেও অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শর্মিলার দুই মেয়ে সোহা আলি খান ও সাবা আলি খান মায়ের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেন। সাবা নিজের মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ার কথাও জানান।

এই প্রসঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি তথ্য। ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ হলেও, ধূমপানের অভ্যাস না থাকলেও এই রোগ হতে পারে। ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের কথায়, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত কোনও মহিলার পক্ষে এটা বোঝা কঠিন হতে পারে যে, কখনও ধূমপান না করেও কীভাবে তাঁর এই রোগ হল।
বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
দিল্লির মতো দূষণপ্রবণ এলাকায় বায়ুদূষণ ফুসফুসের স্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। বাতাসে থাকা অতি সূক্ষ্ম কণা, বিশেষত পিএম ২.৫, শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) বায়ুদূষণ এবং বাতাসে ভাসমান কণাকে মানব শরীরে ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শুধু বাইরের দূষণ নয়, ঘরের ভিতরের দূষণও বিপজ্জনক হতে পারে। অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে এমন রান্নাঘরে রান্না করলে ক্ষতিকর ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা বাড়ে। তবে দূষণের সংস্পর্শে এলেই ক্যানসার হবে, এমন নয়। দূষণ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকের ক্ষেত্রে তার প্রভাব এক রকম হয় না।
ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান, রেডন গ্যাস, অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিকের প্রভাবও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে। অতীতে বুকে রেডিয়েশন চিকিৎসা হয়ে থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়ে। তবে অনেক সময় রোগীর সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখেও ক্যানসারের নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।

অধূমপায়ীদের ক্যানসার কি আলাদা?
ফুসফুসের ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। তার মধ্যে অ্যাডেনোকার্সিনোমা নন-স্মল সেল লাং ক্যানসারের একটি ধরন, যা অধূমপায়ীদের মধ্যেও দেখা যায়। কিছু টিউমারে ইজিএফআর-এর মতো জিনগত পরিবর্তন থাকতে পারে। পরীক্ষার মাধ্যমে এমন পরিবর্তন শনাক্ত করা গেলে নির্দিষ্ট ওষুধের সাহায্যে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে।
ক্যানসারের ধরন, পর্যায় এবং পরীক্ষার ফলের উপর নির্ভর করে চিকিৎসক অস্ত্রোপচার, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, কেমোথেরাপি অথবা একাধিক পদ্ধতির সমন্বয়ে চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে পারেন। অর্থাৎ, রোগী ধূমপান করেন কি না, শুধু সেই তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসা নির্ধারণ করা যায় না।
কোন উপসর্গ অবহেলা করবেন না?
দীর্ঘদিনের কাশি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, ক্রমশ শ্বাসকষ্ট বাড়া বা বুকে অস্বস্তি, কাশির সঙ্গে রক্ত বেরনো, এই লক্ষণগুলিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে যাঁরা কখনও ধূমপান করেননি, তাঁদের মধ্যেও এমন উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
অনেকেই দীর্ঘদিনের কাশি বা শ্বাসকষ্টকে বায়ুদূষণ, অ্যালার্জি বা বারবার সংক্রমণের ফল বলে ধরে নেন। ফলে সঠিক রোগ নির্ণয়ে দেরি হতে পারে। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমশ বাড়লে বা নতুন কোনও উদ্বেগজনক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে ধূমপান করেন না এমন প্রত্যেক মহিলারই সিটি স্ক্যান করানো দরকার, এমন নয়। নিয়মিত কম মাত্রার সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত করার পরীক্ষা নির্দিষ্ট উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের জন্য সুপারিশ করা হয়। অন্যদিকে, উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা করতে পারেন।

ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
ধূমপান এড়িয়ে চলার পাশাপাশি অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া থেকেও দূরে থাকা জরুরি। বাড়িতে বায়ু চলাচলের যথাযথ ব্যবস্থা রাখা, রান্নার সময় ক্ষতিকর ধোঁয়ার সংস্পর্শ কমানো এবং বায়ুদূষণ বেশি থাকলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে অ্যাসবেস্টস বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকলে সুরক্ষাবিধি মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখুন, ধূমপান না করলেই ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি শূন্য হয়ে যায় না। তাই দীর্ঘস্থায়ী কাশি, অকারণে ওজন কমা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
