ছড়া নয়, রাঢ়বাংলার মাটিতে আজও জীবন্ত লোকাচার ‘শিয়াল গেল খালে, শকুন গেল ডালে’। এই লোকবিশ্বাসকে ঘিরেই জিতাষ্টমীর সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে পুজো হয় শিয়াল-শকুনের। দেবতা জীমুতবাহন। সন্তানদের মঙ্গল কামনায় মূলত মায়েরাই এই পুজো করেন। বটগাছের নীচে বসানো হয় বাজার থেকে কেনা শিয়াল ও শকুনের মূর্তি। সামনে রাখা হয় ধানগাছ, কলা, মানকচু, হলুদ, শালুক ফুল ও বটের ডাল। পুজো শেষে ছেলেদের হাতে দেওয়া হয় গোটা শসা ও ভিজানো ছোলা। পরদিন হলুদ কাপড়ে মুড়ে মূর্তি নিয়ে শিশুরা ছড়া কাটতে কাটতে স্থানীয় জলাশয় বা বাঁধে যায়। সেখানেই হয় বিসর্জন।
বিষ্ণুপুরে এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মল্লরাজাদের প্রাচীন ঐতিহ্যও। জিতাষ্টমীর দিন থেকেই শুরু হয় মল্লরাজাদের হাজার বছরের পুরনো দেবী মৃন্ময়ীর শারদীয়া পুজোর সূচনা-পর্ব। মন্দিরের উলটোদিকে দেবীর নিজস্ব থানে বেলগাছের নীচে পট বসানোর রীতি পরিচিত ‘বেল্লি বরণ’ নামে।
লোককথা অনুযায়ী, ত্রেতা যুগের চম্পকনগরের ব্রাহ্মণকন্যা সুভদ্রার সূর্য উপাসনার ফলেই জন্ম নেন চারহাতবিশিষ্ট জীমুত। সূর্যের আশীর্বাদে আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতে জীমুতবাহন নামে তাঁর পুজোর প্রচলন হয়। ইতিহাস গবেষক প্রয়াত চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত এই পুজোর সঙ্গে পুরুষের বলবর্ধনের লোকবিশ্বাসেরও যোগসূত্র দেখিয়েছিলেন। সময়ের পরিবর্তন হলেও বদলায়নি রীতি। জিতাষ্টমীর রাতে তাই আজও শিয়াল-শকুনের সামনে জ্বলে প্রদীপ, লোকবিশ্বাসের হাত ধরে টিকে থাকে জীমুতবাহনের প্রাচীন পুজো।