স্টুডিওতে সারি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা। মাটির পরত পড়ছে একের পর এক কাঠামোয়। কিন্তু যে হাতগুলি প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছিল, সেই হাত আর কোনও দিন মাটি ছোঁবে না। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি স্বামী শিবশঙ্করের সিংহকে হারিয়েছেন বেবি সিংহ মাইতি। হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে এক মুহূর্তে সব শেষ। শিবশঙ্করের হাতেই শুরু হয়েছিল এবারের এইসব প্রতিমা। এখন স্বামীর অসমাপ্ত কাজেই প্রাণ প্রতিষ্ঠার লড়াই তাঁর। মাটির প্রতিটি প্রলেপে মিশে রয়েছে শোক, স্মৃতি আর প্রিয় মানুষটিকে হারানোর প্রতিক্ষণের যন্ত্রণা।
ঝাড়গ্রাম শহরের নতুনডিহির শিল্পালয়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিমা গড়েছেন শিবশঙ্কর। পারিবারিক পরম্পরা ছিল না। নিজের আগ্রহেই শুরু করেছিলেন মৃৎশিল্পের কাজ। ধীরে ধীরে পরিচিতি পেয়েছিলেন শিল্পী হিসেবে। এবারও দুর্গাপুজোর অনেক আগে থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাটির কাজ শেষ হওয়ার আগেই থেমে যায় তাঁর জীবন। স্বামীর চলে যাওয়ায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল বেবির। আগামী দিন কীভাবে চলবে? পুজো উদ্যোক্তাদের থেকে অর্ডার নেওয়া প্রতিমা কীভাবে হবে? সেই বিষয় ভেবেই কেটেছিল কয়েকটা দিন। তবে বেশিদিন থেমে থাকেননি তিনি।

স্বামীর মৃত্যুর পরে অসমাপ্ত প্রতিমাগুলির সামনে দাঁড়িয়ে কাজ থামিয়ে রাখেননি বেবি। একটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষা কর্মীর চাকরি সামলে নিয়মিত আসছেন শিল্পালয়ে। স্বামীর তৈরি করে যাওয়া খড়ের কাঠামোয় মাটি চাপাচ্ছেন, গড়ছেন প্রতিমার অবয়ব। যে মানুষটির কাছে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছেন, তাঁর অনুপস্থিতিতেই এখন সেই কাজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বেবির কথায়, “ওঁর কাছে প্রতিমার চোখ আঁকা শিখেছিলাম। সাহস করে এবার সেটাই করেছি। তবে ভারী কাজগুলো করতে গোপাল ভীষণ রকম সাহায্য করছে।”
শিবশঙ্করের ছাত্র গোপাল শীটও পাশে রয়েছেন। দু’জনে মিলে সম্পূর্ণ করছেন শিবশঙ্করের ফেলে যাওয়া ছ’টি অসমাপ্ত দুর্গাপ্রতিমা। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে লক্ষ্মী, কালী ও জগদ্ধাত্রী প্রতিমা। প্রতিটি প্রতিমার নীচে থাকবে শিল্পীর নাম—‘শিবশঙ্কর সিংহ’। মৃত্যুর পরেও তাঁর পরিচয় বেঁচে থাকবে নিজের সৃষ্টির মধ্যে। ঝাড়গ্রামের একটি মহিলা পরিচালিত আবাসনের পুজোর সঙ্গে শিবশঙ্করের সম্পর্ক ২৩ বছরের। এ বারও সেই পুজোর প্রতিমার কাঠামো তৈরি করে গিয়েছিলেন তিনি। প্রতিমাটি সম্পূর্ণ করছেন বেবি। তাঁর কথায়, “তাঁর সৃষ্টি তাঁরই থাকবে। যতক্ষণ শরীর দেবে, তাঁর দেখানো পথেই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখব।”
