তৃণমূল জমানায় আটকে থাকা জঙ্গলমহল পুরুলিয়ায় রেলের স্পেশাল প্রজেক্ট ফ্লাইওভার লাইন নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করল প্রশাসন। ইতিমধ্যেই এই নিয়ে পুরুলিয়ার জেলাশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। কোন কোন ব্লকের মৌজার প্লট নেওয়া হবে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর জঙ্গলমহলের এই জেলায় রেলের প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হল।
দক্ষিণ-পূর্ব রেলের আদ্রা ডিভিশন লাভজনক বাণিজ্যিক করিডর। তাই যাত্রীবাহী ট্রেনের দেরি কমিয়ে মসৃণ যাতায়াতে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য গৌরীনাথধাম প্রান্ত থেকে পুরুলিয়া (চান্ডিল প্রান্ত) পর্যন্ত ৫.৯ কিলোমিটার এই রেল ফ্লাইওভার লাইন নির্মাণ হবে। এর জন্য জমি অধিগ্রহণ হবে ৩৪.১২ হেক্টর। ২০২৫ সালের এই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ ৪২৮.৭৯ কোটি টাকা। এক বছর আগে এই রেলপথ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে ২০২৭ সালের মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়। কিন্তু বিগত সরকার অধিগ্রহণে ছাড়পত্র না দেওয়াতেই এই প্রকল্প আটকে ছিল। পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো জানান, “বিগত সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে সমাজবিরোধী, দেশবিরোধী কাজ করত। রাজ্যের মানুষের উন্নয়নে রেল ও রাস্তার জন্য জমি দেয়নি। এখন ডবল ইঞ্জিনের সরকার। মানুষের যা প্রয়োজন তাই করা হবে।”
রেলের এই বিশেষ প্রকল্পে পুরুলিয়া দু’নম্বর ব্লকের সুরুলিয়া-৬২, রাঘবপুর-৬৬, বোঙাবাড়ি ৬৫ মৌজা রয়েছে। জমি অধিগ্রহণের বিজ্ঞপ্তিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে। কেউ বলছেন, উন্নয়নের জন্য জমি দেবেন। আবার কেউ বলছেন, তাদের বেঁধে দেওয়া শর্তে জমি দেওয়া হবে। বিধি অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি জারির ৩০ দিনের মধ্যে আপত্তি জানানো যাবে প্রশাসনকে। অভিযোগ, এই বিজ্ঞপ্তি পুজোর আগে জারি হলেও পুজোর পরে কার্যালয় খোলার পর পুরুলিয়া দু’নম্বর ব্লকের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরে টাঙ্গানো হল কেন? যদিও চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ভূমি অধিগ্রহণ প্লটের বিষয়ে জেলাশাসক কার্যালয় থেকে ওই ব্লকের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরকে জানানো হয়। এই অধিগ্রহণ নিয়ে পুরুলিয়া শহরের উপকণ্ঠে থাকা সুরুলিয়ার বাসিন্দারা রবিবার বৈঠক করেন। কারণ এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি জমি অধিগ্রহণ হবে এই সুরুলিয়াতেই।
বর্তমানে এই এলাকায় ১ ডেসিমেল জমির দাম ১ লাখ। সাব প্লট-সহ সুরুলিয়াতে মোট ২৫৫ টি প্লটের উপরে ২৬.১১৬ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। রাঘবপুরে ৭৯টি প্লটে ৬.৮৭৪ হেক্টর, বোঙাবাড়িতে ৯৭টি প্লটে ৮.৭৩৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ হবে। সুরুলিয়ার বাসিন্দা দুলাল পাঠক, দিলীপ রাজোয়াড়রা বলেন, “সরকার যদি জমি নেয় তাহলে তো দিতেই হবে। উন্নয়নের জন্য জমি দিতে কোনও অসুবিধা নেই।” তবে ওই এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী অনিলকুমার পাঠক বলেন, “সরকার অর্থাৎ রেলকে উপযুক্ত দাম দিতে হবে। তাহলে জমি দিতে কোনও অসুবিধা হবে না। “
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব রেলের আদ্রা ডিভিশনের আদ্রা-চান্ডিল শাখা ও পুরুলিয়া-কোটশিলা শাখার মধ্যে গৌরিনাথধাম স্টেশন থেকে এই ফ্লাইওভার আদ্রা-চান্ডিল শাখা ভায়া পুরুলিয়া রেলপথের ছররা-পুরুলিয়া স্টেশনের মাঝে বোঙ্গাবাড়ি এলাকায় যুক্ত করা হবে। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এই প্রকল্পের জন্য বিগত রাজ্য সরকারের কাছে রেলের তরফে চিঠি দেওয়া হলেও বিগত সরকার ছাড়পত্র দেয়নি।
দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ে গত ১৩ অক্টোবর যে হিসাব দিয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরে ১১৪.১৭ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহণ করে ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। যার অধিকাংশ সাফল্য আদ্রা ডিভিশনের। সেই কারণেই পণ্যবাহী ট্রেনকে গুরুত্ব দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেনকে এই বিভাগে বিভিন্ন সময়ে আউটারে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। তাই যাত্রী দুর্ভোগ কমাতেই রেলের ওই বিশেষ প্রকল্প। এই ফ্লাইওভার নির্মাণ হলে পণ্য পরিবহণেও সুবিধা হবে। পাশাপাশি চান্ডিল থেকে বার্নপুর পর্যন্ত তৃতীয় লাইনের কাজ শেষ হলে পণ্যবাহী ট্রেনগুলি সরাসরি তৃতীয় লাইন দিয়ে এসে ফ্লাইওভার রেলপথে সোজা বোকারো বা রাঁচি কিংবা উলটোদিকে সহজেই কম সময়ে জামশেদপুর চলে যাবে।
