সিঁদুরে রাঙা সিঁথি আর সধবা নারী পরস্পরের সমার্থক। অথচ আধুনিকা নারীর কাছে সিঁদুর শুধুমাত্র গ্ল্য়াম লুকের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ মাত্র! কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর দিন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বোন অভিনেত্রী পল্লবী চট্টোপাধ্যায় তো বলেই দিলেন স্বামী না থাকলেও সধবা নারীর সাজ তাঁর মনকে তৃপ্ত করে। তাই তিনি সিঙ্গল হয়েও শাঁখা, পলা, সিঁদুরে অভ্যস্ত। টলিউডের গণ্ডি পেরিয়ে বলিউডেও রয়েছে এমন উদাহরণ। কিংবদন্তি অভিনেত্রী রেখা কার নামে সিঁথি রাঙান আজও রয়েছে সেই ধোঁয়াশা। সিঁদুর যেন নামী নারীর শখ! কিন্তু, সাধারণ মধ্যবিত্ত নারী স্বামীর উপস্থিতিতে সিঁদুর না পরলে সমাজ তাঁকে বাঁকা নজরে দেখে। কিছু অসহায় দরিদ্র নারী আবার সমাজের উটকো ঝামেলা এড়াতে বিধবা হয়েও শাঁখা সিঁদুরকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করেন। সাম্প্রতিক সময়ে সিঁদুরের বিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তসলিমা নাসরিন।
সোশাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে রেখা, পল্লবীর নামোল্লেখ করে ‘সিঁদুরে’ প্রশ্ন তসলিমার। তাঁর মতে, ‘ভানুরেখা গণেশন সিঁদুর পরেন। রূপা গঙ্গোপাধ্যায় সিঁদুর পরেন। পল্লবী চট্টোপাধ্যায় সিঁদুর পরেন। স্বামী নেই বা বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, তবুও সিঁথিতে সিঁদুর আছে। তাঁদের ব্যাখ্যা, নিজের ভালো লাগে, এই সাজ পছন্দ। ভাবছি, সিঁদুরের কি ধীরে ধীরে বিবর্তন হচ্ছে? যে চিহ্ন দেখে নারীর বৈবাহিক পরিচয় বুঝে নিতে অভ্যস্ত আমরা, সেটি কি সেই পরিচয় ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে? স্বামী ছাড়া সিঁদুর পরতে অবশ্য নিম্নবিত্তের অনেক মেয়েকেও দেখেছি। কারও স্বামী ছেড়ে চলে গেছে, কারও স্বামী নেই, অথচ হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর। জিজ্ঞেস করেছি, কেন পরেন। বলেছেন, শাঁখা-সিঁদুর পরলে রাস্তার লোকেরা মর্যাদা দেয়, উটকো ঝামেলা কম করে। মানুষটি চলে গেছেন, চিহ্নটি রয়ে গিয়েছে। সংসারে তার প্রয়োজন ফুরোলেও বাইরের পৃথিবীতে ফুরোয়নি।’

সিঁদুর পরা মেয়েটা আদতেও সুখী কিনা সেই খবর ক’জন রাখে? সমাজের উদ্দেশে সেই প্রশ্ন তুলে লেখিকার সংযোজন, ‘তাঁরা কীভাবে বাঁচেন, কীভাবে সংসার চালান, তার খবরই ভদ্রসমাজ কম রাখে। তাঁদের সিঁদুরের সঙ্গে দাম্পত্যের মিল আছে কি না , তা নিয়ে মাথাব্যথাও কম। নামী নারীদের সিঁদুর নিয়ে খবর হয়, কৌতূহল হয়। তাঁরা বলতে পারেন, আমার ভালো লাগে, তাই পরি। কটাক্ষ হলেও সেটিকে উপেক্ষা করে নিজের মতো থাকার সুযোগ তাঁদের বেশি। তাঁদের শখকে মেনে নেওয়ার জায়গা তৈরি হয়। মাঝখানে সমস্ত দায় বোধ হয় মধ্যবিত্ত মেয়েদের। স্বামী থাকলে সিঁদুর না পরার জন্য নিন্দে শুনতে হয়। স্বামী না থাকলে সিঁদুর পরার জন্যও নিন্দে শুনতে হয়। এক অবস্থায় অনুপস্থিতি নিয়ে আপত্তি, অন্য অবস্থায় উপস্থিতি নিয়ে। আত্মীয়, প্রতিবেশী, পরিচিতজনের কাছে নিজের সিঁথিটিরও যেন কৈফিয়ত দিতে হয়।’
সিঁদুর কারও কাছে দাম্পত্যের চিহ্ন, বিশ্বাস ও অভ্যাস,আবার কারও কাছে সাজ ও নিরাপত্তার কৌশল। এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে তসলিমা লিখছেন, ‘সব পরিবারের চিত্র এক নয়। তবু মনে হয়, সমাজের এক দিকে নিয়মের ব্যতিক্রমকে শখ বলে মেনে নেওয়া হয়, অন্য দিকে বহু ব্যতিক্রম নজরেই পড়ে না। সংস্কারটি অক্ষত রাখার দায় বেশি পড়ে মাঝখানের মানুষগুলোর ওপর। একই সিঁদুর কারও কাছে দাম্পত্যের চিহ্ন, কারও কাছে বিশ্বাস ও অভ্যাস, কারও কাছে সাজ, কারও কাছে নিরাপত্তার কৌশল। সিঁথির রং দেখে আর সব ক্ষেত্রে সংসারের খবর নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তাহলে কি সিঁদুর তার প্রচলিত অর্থ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে? নাকি এই বিবর্তনও শ্রেণি মেনে হচ্ছে? নামী নারীর জন্য শখ, দরিদ্র নারীর জন্য প্রয়োজন, আর মধ্যবিত্ত নারীর জন্য এখনও নিয়ম?’

