প্রাচীন পুঁথির আড়ালে লুকিয়ে গভীর থেকে গভীরতর রহস্য। সেই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করলেই সাক্ষাৎ মৃত্যু! এমনই গা-ছমছমে পরিবেশে গত ৩০০ বছর ধরে কালীপুজো (Kali Puja 2026) হয় বীরভূমের ইলামবাজারের বক্সিবাড়িতে। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসেন মা কালী। তাঁর সঙ্গে পুজো করা হয় রহস্যময় পুঁথিটিরও।
অজয় নদের তীরে সাধনা করা এক সন্ন্যাসীর হাত ধরে বক্সিবাড়ির এই কালীপুজোর সূচনা হয় বলে কথিত আছে। জয়দেব-কেন্দুলির ঐতিহ্যবাহী রাধাবিনোদ মন্দিরের অদূরে বর্ধিষ্ণু সুগড় গ্রামে বক্সি পরিবারের পুজো গোড়া থেকেই বেশ রহস্যে ঘেরা। সন্ন্যাসীর দেওয়া এক পুঁথি ঘিরে আবর্তিত হয়ে চলেছে ৩০০ বছরের অজানা ইতিহাস। শোনা যায়, পুঁথি খুললেই নাকি মৃত্যুর লোককথা। একসময়ে পুঁথির পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে এক ব্যক্তির রহস্যজনক মৃত্যুর লোককথাও প্রচলিত রয়েছে ইলামবাজার জুড়ে। সেই থেকেই পুঁথি খোলার সাহস দেখাননি কেউই। গ্রামের মধ্যে মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডের আসনে দেবী আরাধনার পাশাপাশি তাই হয় পুঁথির বন্দনাও। পুঁথির পাতায় কী লেখা রয়েছে, কোন অজানা ইতিহাস লুকিয়ে আছে তার মধ্যে, আজও তার উত্তর অধরা। তবে পরিবারের ইচ্ছা, প্রাচীন এই পুঁথির রহস্য একদিন উন্মোচিত হোক। অজানা ইতিহাস উঠে আসুক লোককথার আড়াল থেকে।

লোককথা অনুযায়ী, অজয় নদের তীরে হদের ঘাটে তপস্যা করতেন এক সন্ন্যাসী। তিনি বক্সি পরিবারের পূর্বপুরুষদের হাতে একটি প্রাচীন পুঁথি তুলে দেন। নির্দেশ ছিল, পুঁথিটি খোলা যাবে না। সেই পুঁথি ঘিরেই শুরু হয় বক্সিবাড়ির কালীপুজো। পরিবার সূত্রে জানা যায়, বক্সিবাড়ির পূর্বপুরুষ কানুমোহিনী বক্সি, যোগেশ্বর বক্সি একইদিনে স্বপ্নাদেশ পেয়ে সন্ন্যাসীর কাছে পৌঁছেছিলেন। পুঁথির রহস্য অবশ্য আজও অমীমাংসিত। কী রয়েছে তার পাতায়? কোনও প্রাচীন ধর্মীয় আখ্যান, সাধনপদ্ধতি, নাকি অজানা ইতিহাস? এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। রহস্যের আবরণেই রয়ে গিয়েছে পুঁথিটি।
পরিবারের সদস্য প্রদীপ বক্সির কথায়, “অজয় নদের তীরে সাধনা করতেন এক সন্ন্যাসী। তিনি আমাদের পূর্বপুরুষদের হাতে একটি পুঁথি দিয়েছিলেন। সেটাকেই কালীরূপে পুজো করা হয়। কেউ যাতে পুঁথি না খোলেন, এমনটাই বলা আছে। তবে কোনও এক সময়ে কেউ পুঁথিটি খুলেছিলেন। তারপরেই তাঁর মৃত্যু হয়। সেই থেকে আর কেউ পুঁথি খোলেননি। পঞ্চমুণ্ডির আসনে পুজো হয়।” এখানে রয়েছে বলি প্রথাও। বক্সিবাড়ির কালীপ্রতিমার রূপও অন্য প্রতিমার থেকে স্বতন্ত্র। পরিবারের সদস্যরা সারা বছর কর্মসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও পুজোর দিনগুলিতে সকলে ফিরে আসেন সুগড়ে। পরিবারের সদস্য সমীরণ বক্সি বলছেন, “বংশপরম্পরায় আমরা এই পুজো করে আসছি। তিনশো বছরের বেশি প্রাচীন আমাদের পুজো। তবে আসল পুজো হল পুঁথি পুজো। এই পুঁথির নিত্যপুজো হয়। শনি ও মঙ্গলবার কালীমন্দিরে এনে পুঁথিটিকে পুজো করা হয়। আমাদের পরিবারের কেউ পুঁথিটি খোলেননি। তবে কেউ গবেষণার জন্য এর রহস্য উদঘাটন করতে চাইলে আমাদের আপত্তি নেই।”

ইলামবাজারের সুগড় গ্রামের এই কালীপুজো স্থানীয়দের কাছে দেবী আরাধনার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে সেই রহস্যময় পুঁথি। প্রাচীন বিশ্বাস, লোককথা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে বক্সি বাড়ির পুজো হয়ে উঠেছে লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ, রাধা-বিনোদ মন্দিরের ইতিহাস এবং নানা লৌকিক-অলৌকিক কাহিনি এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। সেই ঐতিহ্যেরই আর এক রহস্যময় অধ্যায় সুগড়ের বক্সি বাড়ির কালীপুজো। যেখানে দেবীর আরাধনার সঙ্গে আজও পুজো পায় এক অজানা অতীত রহস্যময় পুঁথিও।
