চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল পেশায় উপহারের আদানপ্রদান নৈতিকতা ও পেশাগত নিয়মের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তা যেন পক্ষপাতিত্বে পরিণত না হয়।
ভারতের মতো দেশে এমনিতেই ওষুধের চড়া দাম নিয়ে নানা সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি, বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ওষুধ তৈরির খরচ আর বাজারে বিক্রির জন্য নির্ধারিত দামের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। যার জেরে ওষুধ সংস্থাগুলো বিপুল মুনাফা করলেও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। সরকারের তরফে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান, প্রধানমন্ত্রী জনৌষধি কেন্দ্র গড়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও সেখানে ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পাড়ার ছোট বা নামী দোকান থেকে কেনা ওষুধেই ভরসা করেন অধিকাংশ।
কিন্তু বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে, ওষুধ সংস্থাগুলি চিকিৎসকদের নানা অনৈতিক সুবিধা ও উপহার দিয়ে অতিরিক্ত ও দামী ওষুধ লিখতে প্ররোচিত করছে, কখনও-বা বাধ্য করছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে ‘ফেডারেশন অফ মেডিক্যাল অ্যান্ড সেল্স রিপ্রেজেন্টেটিভস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া’। সেই মামলায় সর্বোচ্চ আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে দ্রুত কমিটি তৈরি করতে হবে। ডাক্তারদের দামী উপহার দেওয়া, বিদেশ ভ্রমণের স্পনসরশিপ বা নগদ অর্থ দেওয়া বন্ধ করতে কোনও আইনি বা বিধিবদ্ধ কাঠামোর প্রয়োজন আছে কি না, কমিটি তা খতিয়ে দেখে কেন্দ্রকে সুপারিশ জমা দেবে। ৩ সদস্যের কমিটি সংশ্লিষ্ট নানা অংশীদার ও বিশিষ্টদের মতামতও গ্রহণ করবে। বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার ডিভিশন বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছেন।
ওষুধ সংস্থাগুলি চিকিৎসকদের নানা অনৈতিক সুবিধা ও উপহার দিয়ে অতিরিক্ত ও দামী ওষুধ লিখতে প্ররোচিত করছে, কখনও-বা বাধ্য করছে।
দেশে ইতিমধ্যেই ‘ইউনিফর্ম কোড ফর ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাকটিসেস, ২০২৪’ কার্যকর রয়েছে। তবে সংস্থাগুলিকে সম্পূর্ণ আইনি বাধ্যবাধকতার অধীনে আনার ক্ষেত্রে যে-খামতি আছে, তা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই স্পষ্ট। সেই ফাঁক গলে নানা অনৈতিক কাজকর্ম করছে ওষুধ সংস্থাগুলি। কোনও সংস্থা বা ব্যক্তি ডাক্তারদের উপহার দিতেই পারে। চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল পেশায় উপহারের আদানপ্রদান নৈতিকতা ও পেশাগত নিয়মের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের নিয়মে অত্যন্ত স্বল্প মূল্যের বা প্রতীকী উপহার গ্রহণে বাধা নেই। তা সৌজন্যের অংশ। কিন্তু উপহারের বিনিময়ে যখন প্রত্যাশা থাকে, চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট সংস্থার ওষুধ লিখবেন, তা শুধু অনৈতিক নয়, বেআইনিও বটে। উপহার দিয়ে আদতে চিকিৎসকদের ‘কিনে নেয়’ ওষুধ সংস্থা। বিনিময়ে তাদের ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে।
এতে শুধু চিকিৎসা পেশার পবিত্রতাই নষ্ট হয় না, চিকিৎসক-রোগীর মধ্যে যে বিশ্বাসের সম্পর্ক থাকে, সেটাও ক্ষুণ্ণ করে। অন্য সংস্থার একই ওষুধ সস্তা ও সঠিক মানের হলেও নির্দিষ্ট সংস্থার ওষুধ উপহার বা কমিশনের লোভে প্রেসক্রাইব করা রোগীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণার শামিল। সব ডাক্তার না হলেও কিছু চিকিৎসক এই চক্রে সন্দেহাতীতভাবে জড়িত। প্রয়োজন দ্রুত এ বিষয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন। যাতে পেশার পবিত্রতা ও রোগীর স্বার্থ, দুই-ই বজায় থাকে।
