একবার ক্যানসার ধরা পড়ল। চিকিৎসা হল। পরীক্ষায় আর রোগের চিহ্ন মিলল না। জীবনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরল। তাহলে কি ক্যানসার-অধ্যায় শেষ? সবসময় নয়।
মাত্র ৫৬ বছর বয়সে অভিনেতা মুশতাক খানের প্রয়াণ সেই কঠিন বাস্তবতাই আবার সামনে আনল। ‘মুঝসে শাদি করোগি’, ‘ওয়েলকাম’, ‘আশিকি’, ‘গদর ২’-এর মতো ছবিতে অভিনয়ের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা আগে ক্যানসারের চিকিৎসায় সুস্থও হয়ে ওঠেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ফের ক্যানসার ধরা পড়ে। প্রায় আট দিনের মধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয় বলে খবর। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনাই অনেক ক্যানসার-জয়ীর মনে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে, চিকিৎসার পর ক্যানসার আবার কত তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারে? উত্তরটা এক কথায়, যে কোনও সময়।

সেরে উঠলেই কি নিশ্চিন্ত?
ক্যানসারের চিকিৎসার পর শরীরে রোগের আর কোনও চিহ্ন না থাকলে চিকিৎসকেরা অনেক সময় ‘রেমিশন’ শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু তার অর্থ সবসময় এই নয় যে শরীরের প্রতিটি ক্যানসার কোষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।
চিকিৎসার পরেও অতি সামান্য কিছু ক্যানসার কোষ শরীরে থেকে যেতে পারে। এতটাই কম যে প্রচলিত পরীক্ষা বা স্ক্যানে তখন ধরা নাও পড়তে পারে। পরে সেই কোষগুলি আবার বাড়তে শুরু করলে ক্যানসার ফিরে আসে। এই ঘটনাকেই বলা হয় রিকারেন্স বা ক্যানসারের পুনরাবৃত্তি। এই কারণেই চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরেও নিয়মিত ফলোআপের প্রয়োজন হয়।
কয়েক মাসে, আবার কয়েক বছরেও
ক্যানসার ফিরে আসার কোনও নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার নেই। কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসা শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই রোগ ফিরে আসতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক বছর পরেও দেখা দিতে পারে।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্যানসারের পুনরাবৃত্তি প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে দেখা গেলেও, তার অনেক পরেও রোগ ফিরে আসার ঘটনাও সম্ভব। অর্থাৎ, পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেই নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। আবার চিকিৎসার কয়েক মাসের মধ্যেই রোগ ফিরবেই, এমন আশঙ্কাও ঠিক নয়।
কখন ক্যানসার ফিরবে, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক বিষয়- ক্যানসারের ধরন, প্রথমবার রোগ ধরা পড়ার সময় তার পর্যায়, টিউমারের বৈশিষ্ট্য, রোগটি কত দ্রুত বাড়ছিল এবং প্রথম দফার চিকিৎসায় কতটা সাড়া মিলেছিল।

একই জায়গায় নাও ফিরতে পারে
ক্যানসার ফিরে আসা মানেই আগের জায়গাতেই আবার টিউমার তৈরি হওয়া নয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোনও ক্যানসার অন্য অঙ্গে ছড়ালেই সেটি সেই অঙ্গের নতুন ক্যানসার হয়ে যায় না। যেমন, স্তন ক্যানসার ফুসফুসে ছড়ালে সেটি ফুসফুসের ক্যানসার নয়; সেটি স্তন ক্যানসারেরই বিস্তার।
শরীরে কী ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়?
ক্যানসার ফিরে এলেই যে সঙ্গে সঙ্গে উপসর্গ দেখা দেবে, এমন নয়। আবার উপসর্গ হলেও তা সবসময় আগের মতো হবে না। রোগটি কোথায় ফিরে এসেছে, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করে লক্ষণ।
অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের ব্যথা, শরীরে নতুন গাঁট, অস্বাভাবিক রক্তপাত, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্ট, বারবার জ্বর—এই ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষত যাঁদের আগে ক্যানসার হয়েছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
তবে এমন কোনও উপসর্গ দেখা দিলেই ক্যানসার ফিরে এসেছে, এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করেই কারণ নিশ্চিত করতে হয়।

চিকিৎসা শেষ, নজরদারি নয়
ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরবর্তী সময়টিও চিকিৎসারই অংশ। কোন রোগীর কত ঘন ঘন ফলোআপ প্রয়োজন, কী পরীক্ষা করা হবে- তা নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন, আগের চিকিৎসা এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার উপর।
ক্যানসার ফিরে এসেছে বলে সন্দেহ হলে চিকিৎসকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তপরীক্ষা, বিভিন্ন ধরনের স্ক্যান বা অন্য পরীক্ষা করতে পারেন। এরপর রোগটি কোথায় ফিরে এসেছে, কতটা ছড়িয়েছে এবং আগে কী চিকিৎসা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে পরবর্তী চিকিৎসা ঠিক হয়। প্রয়োজন হতে পারে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন, টার্গেটেড থেরাপি বা একাধিক চিকিৎসার সমন্বয়।
মুশতাক খানের ক্ষেত্রে ক্যানসার ফিরে আসার পর রোগ দ্রুত অগ্রসর হয়েছিল বলে যে খবর সামনে এসেছে, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা-ইতিহাসের অংশ। একজন রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার দ্রুত ফিরে আসা মানেই অন্য রোগীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে—এমন নয়।
ক্যানসারের পুনরাবৃত্তির সময় ও ধরন ব্যক্তি এবং রোগভেদে বদলে যায়। তাই চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আতঙ্ক নয়, নিয়মিত ফলোআপ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং শরীরের নতুন পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া।
