বছর খানেক গলসিতে ১৮ বছরের এক যুবককে খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মিলন নাইয়া ওরফে মিলন সাধু নামে এক ব্যক্তি। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধিলাভের উদ্দেশ্যেই ওই যুবককে বলি দেওয়া হয়। গত মহাঅষ্টমীর দিন বাঁকুড়ার সোনামুখীতে বাবা ও স্ত্রীকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকের তন্ত্রসাধনায় আগ্রহ এবং বাড়িতে এক তান্ত্রিকের যাতায়াতের কথা স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
একেবারে সদ্য দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের ঘটনা। সাতসকালেই হাড়হিম কাণ্ড। স্ত্রীকে গলা কেটে খুনের পর কাটা মুন্ডু কোলে মন্দিরের সামনে ধ্যানমগ্ন স্বামী! কারও ধারণা, তন্ত্রসাধনার কারণেই স্ত্রীকে বলি দিয়েছে রিন্টু।

শুধু বঙ্গেই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এমন বহু খুন, আত্মহত্যা, এমনকি গণআত্মহত্যার খবর উঠে এসেছে, যার পিছনে তন্ত্রসাধনার মতো কুসংস্কার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যদিও ঘটনাগুলির প্রকৃত কারণ তদন্তসাপেক্ষ, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তন্ত্রসাধনা ও অলৌকিক ক্ষমতার প্রসঙ্গ জনমানসে কৌতূহল, আতঙ্ক এবং নানা প্রশ্নের উদ্রেক করে।
তবে, কোনও অপরাধের সঙ্গে যখন তন্ত্র, বলি কিংবা অতিপ্রাকৃত শক্তি অর্জনের ধারণা জুড়ে যায়, তখন তার সামাজিক প্রেক্ষাপটও উপেক্ষা করা যায় না। মানুষ কেন এখনও অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের আশায় নৃশংস আচার-অনুষ্ঠানে বিশ্বাস করে? শিক্ষার প্রসার, প্রযুক্তির উন্নতি এবং বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির পরেও কেন সমাজের একটা অংশ অন্ধবিশ্বাসের কাছে আত্মসমর্পণ করে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে সংস্কৃতি, বিনোদন এবং সাহিত্যের ভূমিকাও বিচার করা প্রয়োজন।

সাহিত্য কি নিছক বিনোদন, নাকি মানুষের চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস ও সামাজিক মনন গঠনের অন্যতম হাতিয়ার? এই প্রশ্ন কিন্তু নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক খুনের ঘটনায় তন্ত্রসাধনা, তান্ত্রিকের প্রভাব এবং অলৌকিক শক্তি অর্জনের মতো বিষয় সামনে আসায় প্রশ্নটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রহস্য-রোমাঞ্চ ও থ্রিলার সাহিত্যের নামে তন্ত্র-মন্ত্র, বলি, কালাজাদু কিংবা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা অর্জনের কাহিনি যেভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তা নিয়েও ভাবনার অবকাশ রয়েছে। সাহিত্যের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, লেখক তাঁর কল্পনার জগৎ নির্মাণে স্বাধীন। কিন্তু সেই কল্পনার মধ্য দিয়ে যদি অন্ধবিশ্বাস ও অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা তৈরি হয়, তা হলে তার সামাজিক অভিঘাত নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি তন্ত্র-মন্ত্র ও অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে লেখা সাহিত্যের সামাজিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে সাহিত্যিক মহলেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে যুক্তি উঠেছে, রহস্য-রোমাঞ্চের নামে নিম্নমানের লেখায় কুসংস্কারকে আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে পাল্টা প্রশ্নও উঠেছে, তা হলে কি ভূত, প্রেত, তন্ত্র, মন্ত্র কিংবা অলৌকিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাহিত্য রচনার অধিকার লেখকের থাকবে না? অপরাধের দায় কি কোনও গল্প, উপন্যাস কিংবা লেখকের উপরে তুলে দেওয়া যায়? এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া জরুরি। কারণ তন্ত্র বা অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করাটাই অপরাধ নয়, আবার সাহিত্যের স্বাধীনতার অজুহাতে কুসংস্কারকে উৎসাহিত করাও দায়িত্বশীল সাহিত্যচর্চার পরিচয় হতে পারে না।
বিশ্বর সব ভাষাতেই রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের ইতিহাস দীর্ঘ। বাংলা সাহিত্যেও ভূত, প্রেত, অশরীরী, অলৌকিক ঘটনা, গুপ্তবিদ্যা কিংবা অজানা জগতের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। এই ধরনের কাহিনি মানুষের ভয়, কৌতূহল এবং কল্পনাশক্তিকে উসকে দেয়। পাঠক অজানাকে জানতে চান, অস্বাভাবিক ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজতে চান। এই প্রবণতাকে অস্বীকার করার তো কোনও কারণ নেই। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন কল্পনার জগৎ এবং বাস্তব জীবনের বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য মুছে যেতে থাকে। কোনও গল্পে তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন, মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ কিংবা বলির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়ার কাহিনি যদি বারবার এমনভাবে উপস্থাপিত হয় যে তা বাস্তবসম্মত বা অনুসরণযোগ্য বলে মনে হয়, তা হলে দুর্বল ও অন্ধবিশ্বাসপ্রবণ পাঠকের মনে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিশেষ করে অডিও স্টোরি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক মাধ্যমের বিস্তারের ফলে এই ধরনের কাহিনি এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে সাসপেন্স অডিও স্টোরির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তা সবধরনের শ্রোতার কর্ণগহ্বরে ঢুকছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকাশনা জগতেও তন্ত্র-মন্ত্র, কালাজাদু, অশরীরী শক্তি এবং ভয়াবহ আচার-অনুষ্ঠান নির্ভর কাহিনির বাজার তৈরি হয়েছে। পাঠকের কৌতূহলকে পুঁজি করে এই ধারার বিপণনও হচ্ছে। একসময় যাঁরা কল্পবিজ্ঞান, সামাজিক সমস্যা কিংবা মানুষের জীবনসংগ্রাম নিয়ে লিখতেন, তাঁদের একাংশও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী এই নতুন ধারায় কলম ধরছেন। প্রকাশনা একটি ব্যবসা, সেখানে বিক্রির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বাজারের চাহিদাই যদি লেখার বিষয়, ভাষা এবং মূল্যবোধ নির্ধারণ করতে শুরু করে, তা হলে সাহিত্যিকের নিজস্ব দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি সামনে আসবেই।
সাহিত্য মানুষের চিন্তাজগৎকে অবশ্যই প্রভাবিত করে। তবে মানুষের আচরণ কোনও একটি বই বা গল্পের দ্বারা এককভাবে নির্ধারিত হয় না, এমনটাও মত লেখক-পাঠক কুলের একাংশের। পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, মানসিক গঠন এবং চারপাশের বিশ্বাসের জগৎ মিলিয়েই মানুষের মন তৈরি হয়। তাই তন্ত্রসাধনা নির্ভর থ্রিলার পড়ে কেউ খুন করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, এমন সরল সিদ্ধান্ত যেমন যদি গ্রহণযোগ্য মা-ও হয়, তবু জনপ্রিয় সংস্কৃতির কোনও প্রভাবই নেই বলে বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়াটাও যুক্তিসঙ্গত হবে না।
