Hashtagintro

দুর্গাপুজোয় মাংস খেলেই ‘পাখন্ডি’! ধর্মের বিধান না ব্যক্তিগত মত?

দুর্গাপুজোয় মাংস খেলে ‘পাখন্ডি’? বাঙালির আমিষভোজন নিয়ে সাম্প্রতিক এই বিতর্কের আড়ালে আসলে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন রয়েছে- ধর্মের বিধি নির্ধারণের অধিকার ও তার প্রমাণ কী? শাস্ত্র, যুক্তি ও প্রমাণের কাঠামোয় দাঁড়িয়ে দেখলে, ব্যক্তিগত মত বা খামখেয়ালিপনাকে ‘ধর্মের বিধান’ বলে প্রতিষ্ঠা করা যায় কি? লিখছেন সৌরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রমাণ তিন ধরনের: প্রত্যক্ষনির্ভর, অনুমাননির্ভর, শব্দপ্রমাণনির্ভর। ‘প্রত্যক্ষ’ প্রমাণ হল– চোখ দিয়ে ঘটতে দেখা। একটি বাড়ি থেকে অনবরত ধোঁয়া বেরতে দেখে, সেই বাড়িতে আগুন লেগেছে– সেটা বোঝা হল ‘অনুমান’। এবং ‘শব্দপ্রমাণ’ হল সেই প্রমাণ, যা কোনও বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে শোনা বা পড়া জ্ঞান– যেটিকে আমরা ‘সত্যি’ বলে মেনে নিই। যেমন, ‘মহাভারত’ মহাকাব্য থেকে কৃষ্ণর কথা জেনে, কৃষ্ণ বলে কেউ একজন ছিলেন মেনে নেওয়া।

এই তিন প্রকারের প্রমাণের মধ্যে শব্দপ্রমাণকে লঘু চোখে দেখা হয়। যা কিনা ভুল। সূর্য– সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে– এটি সম্পূর্ণত শব্দপ্রমাণ। শিক্ষক এটি বলেছেন, আমরা মেনেছি। মহাকাশ থেকে সূর্যের ছবি দেখালেও তা শব্দপ্রমাণই বটে। কারণ সেই সৌরমণ্ডল-মধ্যবর্তী সূর্যের সঙ্গে আমাদের চোখের সংযোগ নেই, আর এই বিষয়ে মানব অনুমান খাটে না। একইভাবে ধর্ম-অধর্ম বিরোধও ‘প্রত্যক্ষ’গ্রাহ্য নয়, এবং ‘অনুমান’ করেও এর কিনারা করা যায় না। অতএব, দুর্গাপুজোয় মাংস ভক্ষণের বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রমাণ শ্রুতি এবং স্মৃতিগ্রন্থ।

আশ্বিন মাসের বিধিত নৈবেদ্যর মধ্যে হরিণ এবং ছাগলের উল্লেখ আছে। ফলে এ কথাটাও পুরো ঠিক নয় যে, ব্রত মানেই নিরামিষ।

শাস্ত্রবাক্যকে আধার করে, তর্ক সহকারে সত্যোন্মোচনের চেষ্টা করা যাক। শ্রীশ্রীদেবীভাগবত পুরাণের শ্লোক– ‘মাংসাশনং যে কুর্বন্তি তৈঃ কার্যং পশুহিংসনম্‌।/ মহিষাজোরভ্রাণাং বলিদানং বিশিষ্যতে॥’– অর্থাৎ ‘যারা মাংস ভক্ষণ করে, তাদের পশুবলি সম্পাদন করা উচিত; মহিষ, ছাগ ও বরাহের বলি বিধেয়।’ মানে, এখানে বলি দিয়ে প্রসাদী মাংস ভক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
এবার যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, এই শাস্ত্রবাক্য রূপকাত্মক– আসলে বলি দেওয়া মাংস খেতে বলছে না, কারণ বেদে লিখিত আছে– ‘মা হিংসাৎ সর্বভূতানি’– অর্থাৎ ‘কোনও প্রাণীর প্রতি হিংসা করো না’– তাহলে তো এমন নির্দেশ ঠিক হবে না!

যদিও বৈদিক অহিংসা-বাক্য এবং এই বলি-বাক্যের মধ্যে বিরোধ নেই। দু’টি বাক্যের ‘বিষয়’ আলাদা হওয়ার কারণে। ‘বেশি চিনি খেলে ডায়াবেটিস হয়’, আর ‘পায়েসে চিনি লাগে’ বিরুদ্ধবাক্য নয়। তাই পায়েসে চিনি যোগ করা থেকে আমাদের আলাদা করে অর্থ নিষ্পন্ন করার দরকার হয় না। বলি-বাক্যও তেমনই রূপকার্থক নয়।

‘দুর্গাপুজোয় মাংস খেতে নেই’– কেউ এরকম প্রস্তাব দিলে, সেটিও খতিয়ে দেখার মতো। ‘পুজো’ শব্দের অর্থ যদি ‘ব্রত গ্রহণ করা’ বুঝি, তাহলে বলব, ব্রত মূলত নিরামিষ। কিন্তু এও ঠিক যে, ব্রত স্বেচ্ছাকৃত, এতে বাধ্যবাধকতা নেই। তাহলে ব্রত না নিলে কী হবে? শাস্ত্রে আমিষ দুর্গাব্রত মানা হয়েছে। ক্যানের ‘ক্যাটালগ অফ ব্রত লিস্ট’ খুললে আমরা দেখতে পাই যে– ‘দেবীপুরাণ’, ‘কৃত্যকল্পতরু’ (২২৫-২৩৩) এবং হেমাদ্রির ‘চতুর্বর্গচিন্তামণি’-তে বিশেষ দুর্গাব্রতের উল্লেখ আছে, যা শ্রাবণ শুক্ল অষ্টমী থেকে শুরু হয়ে এক বছর যাবৎ চলে। তার মধ্যে, আশ্বিন মাসের বিধিত নৈবেদ্যর মধ্যে হরিণ এবং ছাগলের উল্লেখ আছে। ফলে এ কথাটাও পুরো ঠিক নয় যে, ব্রত মানেই নিরামিষ।

দণ্ডবিধান ব্যক্তিগত পছন্দ বা খেয়াল অনুযায়ী নয়, ধর্মের নির্ধারিত ন্যায়নীতি অনুসারে হওয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে, ব্রত স্বেচ্ছাকৃত ধার্মিক অনুষ্ঠান– যেখানে কয়েকটা বিশেষ নিয়ম, বিশেষ সময়ের জন্য, বিশেষ পদ্ধতির দ্বারা, কোনও বিশেষ আধ্যাত্মিক ফলের প্রত্যাশায় পালন করা হয়। অন্যদিকে, পুজো হল এক বা একাধিক দেব-দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি সহকারে বিশেষ পদ্ধতিতে বিভিন্ন শাস্ত্রনির্ধারিত উপচারের অর্পণ করা। কোনও একটি ব্রতের অঙ্গ হিসাবে পুজো থাকতে পারে, কিন্তু পুজো করা মানে ব্রত রাখা নয়। ‘বাচস্পত্যম্‌’ বইয়ে উল্লিখিত যে, ‘মধু মাংস বিহায়ান্যদ্ ব্রতে চ হিতমীরিতম্‌’– অর্থাৎ ‘মধু ও মাংস’ ছাড়া অন্য খাবার ব্রতের জন্য হিতকর নয়। কিন্তু ব্রত, পুজো বা অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাংসের ব্যবহার বা ভক্ষণ বর্জনীয়ও নয়, কেননা, যদি তা হত, তবে এরকম মাংস-অঙ্গীকৃত-বিধি আমরা শাস্ত্রে পেতাম না। দুর্গাপুজোয়, আমিষ খেলে, বাঙালি মাত্রই ‘পাখন্ডি’ বলে পরিগণিত হবে, এ কথায় ‘ধর্ম’ আসলে ফলানো ফুটে ওঠে। যা ক্ষমতার দম্ভে করা খামখেয়ালিপনা, জাতি-বিষয়ক পক্ষপাতিত্ব করা।

‘বিভজ্য দণ্ডঃ কর্তব্যো ধর্মেণ ন যদৃচ্ছয়া’ অর্থাৎ ‘বিবেচনা করে দণ্ড প্রদান করতে হবে; ধর্ম অনুসারে, খেয়ালখুশি বা স্বেচ্ছাচারিতার দ্বারা নয়।’ (মহাভারত ‘শান্তি পর্ব’)। এখানে ‘ন যদৃচ্ছয়া’ সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ‘যদৃচ্ছা’-র অর্থ খেয়াল, আকস্মিকতা বা ব্যক্তিগত ইচ্ছানির্ভরতা। অর্থাৎ, দণ্ডবিধান ব্যক্তিগত পছন্দ বা খেয়াল অনুযায়ী নয়, ধর্মের নির্ধারিত ন্যায়নীতি অনুসারে হওয়া উচিত। অর্থাৎ শাস্ত্রও স্বেচ্ছাচারী ধর্ম প্রতিপাদন সমর্থন করে না।

তাহলে যারা করে, তাদের কী হয়? ‘মনুস্মৃতি’ (৮.১৮, ৮.১৯) বলছে, ‘অধর্মের এক-চতুর্থাংশ তার কর্তার উপর বর্তায়, এক-চতুর্থাংশ সাক্ষীর উপর, এক-চতুর্থাংশ সভার সমস্ত সদস্যর উপর এবং এক-চতুর্থাংশ রাজার উপর বর্তায়। যেখানে যে ব্যক্তি নিন্দার যোগ্য, তঁাকে যথাযথভাবে নিন্দিত বা দণ্ডিত করা হয়, সেখানে রাজা এই (অপরাধের) দোষ থেকে মুক্ত হন এবং সভাসদরাও মুক্ত হন; অপরাধের দোষ সেই কর্তার উপরই বর্তায়।’ কেন বিষয়টি প্রাসঙ্গিক, তা ইতিমধ্যে বলা হয়েছে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অটোমেশন কিউএ ইঞ্জিনিয়ার
sourojit04@gmail.com

Source: Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language