সবেমাত্র কাজ শুরু করেছিলেন ওঁরা! জীবনের অট্টালিকার নুড়ি-পাথর কুড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথের সুতো বুনছিলেন কেউ! হয়তো কাজের সুখে ভবিষ্যতের সুখ খুঁজছিলেন কোনও কোনও শ্রমিক পাখি! কিন্তু নিরন্তর কাজের তাগিদে আচমকা নামে অন্ধকার! কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে তছনছ হয় জীবন! খিদের তাগিদ হয়ে যায় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার অঙ্গীকার!
তারাতলা বিপর্যয়। চলতি বছরের ২৪ জুন দুপুরে বিকট শব্দে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পরে নির্মীয়মান গোডাউন। ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়েন বহু শ্রমিক। উদ্ধার হয় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন দেহ! বহু শ্রমিক উদ্ধার হন জীবিত অবস্থায়। মুহূর্তেই তোলপাড় হয় রাজ্য। কান্না, যন্ত্রণার মধ্যেই চলতে থাকে দুরন্ত গতির উদ্ধারকাজ।

তারপর কেটে গিয়েছে কয়েক মাস। অনেকখানি সরেছে ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছিলেন যারা, তাদের মধ্যে ১৬ জনের আর ঘরে ফেরা হয়নি। ওই দুর্বিষহ ঘটনার অভিঘাতে রক্তাক্ত হয়েছিলেন অনেকেই। দীর্ঘ চিকিৎসার পর কেউ পুরনো পেশায় ফিরেছেন, কেউ শোকে বিহ্বল আজও!
দেবাশিস দাস। উত্তর ২৪ পরগণার নোয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল থেকে একাধিক জনকে সঙ্গে নিয়ে আগের রাতে পৌঁছন অভিশপ্ত গোডাউনে। সকলেই পেটের টানে গিয়েছিলেন সেদিন। দেবাশিস নিজেও। কিন্তু তাঁর দলের দু’জনের মৃত্যু হয় ওই ঘটনায়। কোনও রকমে বাঁচেন কয়েকজন। গুরুতর আহত হন দেবাশিস নিজে। বহুদিন ঘরে থাকার পর অবশেষে পুজোর আগে স্ত্রী, দুই ছেলের জন্য কাজে ফিরেছেন দেবাশিস। বহু প্রশ্ন, বিতর্ক, বদনামকে সঙ্গী করে ফের ‘অভিশপ্ত’ কাজে ফিরতে হয়েছে তাঁকে! ফের বাঁচার জন্য নতুন লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন তিনি।
দেবাশিস বলছেন, “মাসখানেক হয়েছে আবার ঢালাইয়ের কাজ করছি। সবসময় মন খুব খারাপ থাকে, সেদিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ভুলতে পারি না আজও। আমার দুটো কাজের ছেলের মৃত্যু রোজ মনে পড়ে। কিন্তু কাজ না করলে আর চলছে না!”
এখনও শরীরে ব্যথা রয়েছে দেবাশিসের! মনের অসুখ খানিকটা সেরেছে। আজও কেউ কেউ বলেন, “তোমার সঙ্গে কাজে গিয়ে মরেছে!” কেউ আবার আপন করে নেন রোজ। তবুও সবকিছু ভুলে সন্তানকে ভালো রাখতে কাজ করেন ওঁরা। তাঁর কথায়, “সেদিন অন্ধকার জায়গায় আটকে ছিলাম, চারিদিকে বীভৎস চিৎকার, আওয়াজ! বুঝতে পারছিলাম, আর হয়তো বাঁচব না! কিন্তু ঈশ্বরের আশীর্বাদে প্রাণে রক্ষা পেয়েছি!”
বাড়ির কাছেই ঢালাইয়ের কাজ শুরু করেছেন তিনি। সেদিনের আতঙ্ক আজও কাঁপায় ওঁদের! নির্মীয়মান বাড়ির উপরে উঠতে এখনও ভয় পান দেবাশিস! যে-মানুষ এক সময়ে পাহাড়প্রমাণ বহুতলে কাজ করত, আজ সে লোক নিচেই দাঁড়িয়ে থাকে।
তাঁর কথায়, “পুজো আগে ভালো কেটেছিল (Durga Puja 2026)। এবার তো মন থেকেই ভালো লাগছে না কিছু। এই পুজো ভালো কাটার কথা নয়। সবসময় কেমন একটা লাগে। চেষ্টা করি শক্ত থাকতে, তবুও মানুষ তো, কাছের লোকগুলোর কথা মনে পড়বেই। যেমন বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ওদের কথা খুব মনে পড়ছিল।”
এবার আর পুজোয় নতুন জামা কেনার সময় নেই! সবটাই তলিয়ে তারাতলার অভিশপ্ত গোডাউনে! তবুও এগোন তিনি। সব কালো পেরিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা, বেঁচে থাকার চেষ্টাই মুখ্য ওঁদের কাছে।
