বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি চলে গিয়েছেন। সকালে ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই বিষাদের কুয়াশা বিনোদুনিয়ায়। নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই একটা অবিশ্বাসের বাতাবরণ সর্বত্র। এমন প্রাণবন্ত এমন মানুষ কী করে এমন আচমকা চলে যেতে পারেন! আর সেই সঙ্গেই শুরু হয়েছে অভিনেতা ও নায়ক নানাকে নিয়ে নানা আলোচনা। তাঁর বিখ্যাত সংলাপের পাশাপাশি ‘কমন ম্যান’ নানাও উঠে আসছেন লাইমলাইটে। নানা এমন এক মানুষ, যিনি কখনও ‘হিরোর বর্ম’ গায়ে চাপাননি। বরং তিনি আসলে নিজেকে চরিত্রাভিনেতা হিসেবেই তুলে ধরেছেন। আমজনতাই তাঁকে নায়কের আসনে বসিয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন তাঁর অভিনয় জগতে আসার বিষয়টি। পাড়ার থিয়েটার থেকেই নানা অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন। মহারাষ্ট্রের রায়গড়ের ছেলে বিশ্বনাথ (এটাই আসল নাম) খুব অল্প বয়সেই আবিষ্কার করেছিল, অভিনয় করলে লোকের বেশ প্রশংসা পাওয়া যায়! আর এই কারণেই পরবর্তী সময়ে তরুণ নানার মঞ্চে আসা। নিজেকে মঞ্চের লোক মনে করা নানা রুপোলি পর্দায় আসতেই চাননি প্রথমে। স্মিতা পাটিলের উৎসাহেই তাঁর বিনোদন দুনিয়ায় পা রাখা। কিন্তু মনে মনে নিজেকে কখনও ‘হিরো’ ভাবতে চাননি।
জানা যায়, একবার এক প্রযোজক বাড়িতে এসেছে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে। এর মাঝেই অভিনেতার মা এসে তাঁকে বলে যান, আটা নেই বাড়িতে। এরপর সেই প্রযোজককে বসিয়ে রেখে নানা নিজেই যান দোকানে। বিস্মিত ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন, রুটি তো তিনিও খাবেন। তাহলে সেটা তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় আটা দোকান থেকে নিজে নিয়ে এলে এতে বিস্ময়ের কী আছে!
আরেকবার, বলিউডের এক নামী প্রযোজক তাঁর বাড়িতে এলে তাঁকে রেঁধে খাওয়ান নানা। একেবারে মাটন! আর তা খেয়ে তৃপ্ত সেই প্রযোজক। কিন্তু এরপরই তাঁর রসভঙ্গ ঘটিয়ে নানা সটান নির্দেশ দেন, এঁটো বাসনগুলি মেজে দিতে! এমনই আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর। তথাকথিত স্টারডমের ধার ধারেননি। আবার ‘বদমেজাজ’ দেখিয়ে ফেলেছেন যত্রতত্র। শোনা যায় ‘আ ওয়েডনেসডে’র মতো ছবিতে প্রধান চরিত্রে তাঁকে ভাবা হলেও নির্মাতারা স্রেফ পিছিয়ে যান তাঁর মেজাজের কথা ভেবেই।
নানা চলে গিয়েছেন। রয়ে গিয়েছে এই সব ‘গল্প’। নানা পাটেকর আসলে বলিউডের ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ নায়কত্বের জ্যাকেটটা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন হ্যাঙারে। বরং নিজের মতো করে তৈরি করেছিলেন নায়কত্বের সংজ্ঞা। চরিত্র নিয়ে ভেবেছেন। সংলাপ নিয়ে ভেবেছেন। সবেতেই রেখেছেন স্বকীয়তা। আর এর নেপথ্যে থেকে গিয়েছে একজন সাধারণ মানুষের মন। যে মন তারকা খ্যাতি হারানোর ভয়ে মুদির দোকানে যাওয়া নিয়ে সংকোচ করে না। নানা পাটেকর আসলে সেই ‘কমন ম্যান’, যিনি তাঁর সাধারণত্বের দ্যুতিতেই অসাধারণ!