শক্তিই মোক্ষ। তঁার অারাধনাও সর্বজনীন। মা কালী এমন এক দেবী, লুটেরার হাত থেকে বঁাচতে গৃহস্থ নিষ্ঠাভরে যেমন তঁার পুজো পালন করেন, তেমনই ডাকাতরাও সাফল্য লাভের অাশায় দেবীর পায়ে ফুল দিয়ে ‘অপারেশন’-এ বেরয়। কালীর পুজো হয় মহা সমারোহে পাড়ার মণ্ডপে, অাবার ভূতপ্রেতময় শ্মশানেও। সবার লক্ষ্য শক্তির সাধনা। শক্তির দেবীর অাশিস পাওয়ার প্রার্থনা। অতএব নির্দ্বিধায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘দুষ্ট’ এবং ‘শিষ্ট’ দুয়েরই অারাধ্য হলেন মহাকালী।
তবে তিনি কার প্রতি সদয়, তা একান্তই দেবীর করুণা। কতকটা এমনই যুক্তি সামনে রেখে থানায় থানায় কালীপুজো করার নিদান দিয়েছেন রাজে্যর নতুন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। পূর্বাশ্রমে জগন্নাথবাবু দক্ষ সাংবাদিক ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন। প্রশাসনিক স্তরের পরিবেশ তঁার পরিচিত। ফলে তিনি সচেতনভাবেই এ-কথা বলেছেন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, শুধু কার্তিক অমাবস্যায় পুজো কেন, কালী মায়ের স্থায়ী মন্দিরও হতে পারে থানায় ঢোকার মুখে। তাতে দ্বিপাক্ষিক সুবিধা। অভিযুক্ত যেমন গারদে প্রবেশের অাগে মায়ের কাছে দ্রুত খালাসের প্রার্থনা করার সুযোগ পাবে, তেমনই অপারেশনে বেরনোর অাগে দেবীর কাছে পুলিশ কর্মীরা অাশীর্বাদ চেয়ে মনোবল বাড়িয়ে নেবে এই বলে যে তাদের অভিযান যেন সফল হয়, অপরাধী যেন ধরা পড়ে। মন্ত্রী তঁার নিজের জেলা বীরভূমের পুলিশ সুপারকে থানার কালীপুজোর বিষয়টি দেখতেও বলেছেন। যদিও তঁার বার্তা অন্য জেলাতেও সঞ্চারিত হয়েছে। অতঃপর অামাদের অপেক্ষা করতে হবে থানায় সতি্য এবার কালীপুজো হয় কি না।
পুজো করা মানে ‘হিন্দুত্ব’, অথবা অহিন্দুদের ‘বিরোধিতা’ করা এমন মনে করার কারণ অাছে কি?
অতীতে থানায় কালীপুজো করার চল ছিল না এমন নয়। কিছু কিছু জায়গায় হতও। কিন্তু বাম অামলে ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই মন্ত্রীর বক্তব্য সামনে অাসতে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই রে-রে করে উঠেছে। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
বলা হয়েছে, থানা একটি নিরপেক্ষ জায়গা, সেখানে কেন পুজোঅাচ্চা হবে। একই সঙ্গে এমনও যুক্তি সামনে এসেছে যে, স্কুলে যদি সরস্বতী পুজো হয়, তাহলে থানায় কালীপুজো হতে দোষ কোথায়! বিদ্যার দেবীর অারাধনায় ছাত্ররা যখন উদার, তখন শক্তির দেবীর পুজোয় পুলিশ এবং অপরাধী উভয় অাগ্রহী হতেই পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিশ্বকর্মা পুজোও তো হয়। পুজো করা মানে ‘হিন্দুত্ব’, অথবা অহিন্দুদের ‘বিরোধিতা’ করা এমন মনে করার কারণ অাছে কি? অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে অাজানের ব্যবস্থা অাছে। এয়ারপোর্টে ‘প্রেয়ার হল’-এও সব ধর্মের দরজা খোলা। স্বাভাবিকভাবেই পক্ষে এবং বিপক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছেই। তবে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল সেই বিতর্কে না গিয়েই বলা যায় মন্ত্রিসভার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বলার পর বিষয়টি মাত্রা পেয়েছে। সরকার কোনও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেয়নি বলে ধরে নেওয়া যায় সম্মতির লক্ষণ। অতঃপর পরিস্থিতি কী দঁাড়াবে সেটাই দেখার।
কালীপুজো অনুষঙ্গে নেতাদের পরিচয় সতি্য সতি্য মিথের মতো।
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় তঁার যুক্তির সপক্ষে রঘু ডাকাতের উদাহরণ সামনে এনেছেন। শুধু রঘু কেন, অনেক ডাকাতই কালীপুজো করেছে নিজের মতো করে। ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরাণীরাও কালীপুজো করেছে। স্বাধীনতার সময় বহু বিপ্লবী সংগ্রামে নামার অাগে কালীপুজো করে মনের শক্তি সঞ্চয় করতেন। স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কালীপুজোয় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। কলকাতার মেয়র থাকার সময় তিনি জানবাজারের কালীপুজো কমিটির সভাপতি হন। অাবার কালীপুজোতেও কখনও এসেছে সম্প্রদায়গত বিরোধের ছাপ। শান্তিপুরে দেশভাগের অাগে ১৯৪৬ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল। প্রতিরোধে নেমে হিন্দু ছেলেরা একজোট হয়ে হাতে লাঠি নিয়ে পুজো করেছিল এক ডাকাতকালীকে– যে দেবী ‘বামা কালী’ রূপে এখনও পূজিত। শ্মশান থেকে মাথার খুলি এনে ঠাকুরের পাটে রেখে পুজো হত। শত শত মশাল জ্বালিয়ে সেই দেবীকে নিয়ে যাওয়া হত নিরঞ্জনে।
কালীপুজো এবং রাজনীতি কখনও কখনও বড় মাত্রা পেয়েছে। এক্ষেত্রে কংগ্রেস ঘরানার নেতাদের নামগুলি সবার অাগে অাসবে। একটা মজার গল্প বলি। কংগ্রেসের বর্ণময় চরিত্র ছিলেন বরকত গনি খান চৌধুরী। তিনি যখন সোমেন মিত্রর উপর রেগে যেতেন তখন তঁার নাম ধরে ডাকতেন না। বলতেন, ‘ওই অামহার্স্ট স্ট্রিটের নেতা, যে কালীপুজো করে। ওকে ডাক তো!’ প্রদেশ কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে প্রবীণ বরকতের উপেক্ষার কারণও ছিল বেশ চমকপ্রদ। সোমেনবাবু তখন প্রদেশের সাময়িক সমীকরণে প্রণববাবুর শিবিরে। তাতেই রাগ বরকতের। সোমেনকে তিনি খুবই স্নেহ করতেন। কিন্তু রেগে গেলে ওই সময়, ‘কালীপুজো করে যে নেতা’ বলে ডাকতেন। বরকত-প্রণব সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। দিল্লিতে দু’জনেই মন্ত্রী ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী থেকে রাজীব, সোনিয়া– দু’জনকেই গুরত্ব দিতেন। ফলে রাজ্য কংগ্রেসে সোমেন-মমতা বিভাজনের অাগে প্রণব-বরকতের বিভাজন ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সে অামলে বিরোধ মানে বেপরোয়া সংঘাত নয়। দু’জনে দু’জনকে প্রাপ্য সম্মান দিতেন। দু’জনেই কিন্তু সোমেনের কালীপুজোয় এসেছিলেন একাধিকবার।
কালীপুজো অনুষঙ্গে নেতাদের পরিচয় সতি্য সতি্য মিথের মতো। সোমেন মিত্র ডাকাবুকো নেতা হিসাবেই সুবিদিত ছিলেন। মধ্য কলকাতায় ‘দাদা’ ইমেজেই তিনি ছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম্। পরে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হয়েছিলেন। শিয়ালদহ বিধানসভা থেকে লাগাতার জিতে এসেছেন। তৃণমূলের টিকিটে লোকসভার সদস্যও হন। তবু, এখনও তঁার পরিচয়ের সঙ্গে কালীপুজো জড়াবেই। প্রয়াত হয়েছেন। অামহার্স্ট স্ট্রিটের ‘সোমেনের কালীপুজো’-র কথা অালোচনা থেকে হারায়নি।
অামহার্স্ট স্ট্রিটের অন্য প্রান্তে অার-এক কালীপুজো বেশ জমজমাট রূপ নেয় পরবর্তী কালে।
যেমন হারায়নি বিখ্যাত ‘ফাটাকেষ্ট’-র পুজোর কথা। প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণচন্দ্র দত্তও কংগ্রেস করতেন। ডাকনাম ছিল ‘কেষ্ট’। কালক্রমে ‘ফাটাকেষ্ট’। নকশালদের সঙ্গে তঁার সংঘাত ছিল সর্বজনবিদিত। মস্তান হিসাবে পরিচয়, অথচ রবিনহুড ইমেজ। ১৯৫৭ সালে নিজের দাপট দেখাতে কালীপুজো শুরু করেন। কে না এসেছেন ফাটাকেষ্টর পুজোয়! এসেছিলেন স্বয়ং মহানায়ক উত্তমকুমার। এসেছিলেন সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। তিনি মানত করে দেবীকে সোনার নাকছাবি দিয়েছিলেন। এখনও ফাটাকেষ্টর কালীপুজো হয়। ফিরে অাসে কৃষ্ণবাবুকে নিয়ে নানা মিথের কাহিনি।
অামহার্স্ট স্ট্রিটের অন্য প্রান্তে অার-এক কালীপুজো বেশ জমজমাট রূপ নেয় পরবর্তী কালে। সেই পুজো তাপস রায়ের। তাপসবাবু কংগ্রেস, তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়ে এখন রাজে্যর শিল্পমন্ত্রী। রাজনীতিতে উত্থান-পতন হলেও তঁার পুজোয় কোনও ভাটা পড়েনি। কংগ্রেসের দুই অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায় ও প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি। তঁাদের বাড়িতে অবশ্য দুর্গাপুজো হয়। প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ও বীরভূমের মিরাটি গ্রামে বনেদি বাড়িতে গিয়ে নিজে পুজোয় বসতেন। প্রিয়বাবুও চলে যেতেন কালিয়াগঞ্জের সাবেকি বাড়িতে। দুর্ভাগ্য, পুজোর সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তঁাকে সুস্থ করা যায়নি।
তবে পরবর্তীকালে কালীপুজোয় সবচেয়ে নজরকাড়া পরিস্থিতি হয়েছে মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের বাড়িতে।
৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের সেই পুজো ক্রমে ক্রমে অাকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বরাবর মমতার কর্মী সমর্থকদের ঢল নামে পুজোর দিনে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই পুজোয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অানাগোনা লক্ষ করা গিয়েছে। অাইএএস, অাইপিএস থেকে চিত্রতারকারা ভিড় করে থাকেন। কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে অঞ্জলিও দিতে দেখা গিয়েছে। রাজনীতির পালাবদলের পর এবারও মমতার বাড়িতে একইভাবে পুজো হবে। হয়তো কর্মীরা অাসবেন। তবে নিশ্চিতভাবে দেখা যাবে না ক্ষমতার স্রোতে ভেসে অাসা মুখগুলোকে।