অসুর নয়, ত্রিশূলের সামনে কাত হয়ে আছে এক গোরা সাহেব! কালো কোট, পায়ে চকচকে বুট জুতো। এ তো পৌরাণিক গল্প নয়, বরং খাস দক্ষিণ কলকাতার প্রাচীন ইতিহাস। ভবানীপুরের চন্দ্রনাথ স্ট্রিটের দে বাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব আজও লালন করে চলেছে সেই ব্রিটিশবিরোধী অভিনব প্রতিবাদ।
সালটা ১৮৭০। দক্ষিণ কলকাতার দে পরিবারে শুরু হল দেবী দুর্গার আরাধনা। কিন্তু এর নেপথ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর ঘটনা। শোনা যায়, পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা রামলাল দে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ দেখেন, লাল পাড় সাদা শাড়ির এক অচেনা নারী দুই পুত্র ও দুই কন্যাকে নিয়ে চুপচাপ ঠাকুরদালানে ঢুকছেন। মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেলেন সেই দেবী রূপী নারী! কিছুদিন পর ছাদের কার্নিশে বসে পা দোলাতেও দেখা গেল তাঁকে। অবশেষে রামলালবাবু পেলেন স্বপ্নাদেশ। ব্যস, ২৬ নম্বর চন্দ্রনাথ স্ট্রিটে শুরু হয়ে গেল মহামায়ার আবাহন।

সালটা ১৮৭০। দক্ষিণ কলকাতার দে পরিবারে শুরু হল দেবী দুর্গার আরাধনা। কিন্তু এর নেপথ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর ঘটনা। শোনা যায়, পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা রামলাল দে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ দেখেন, লাল পাড় সাদা শাড়ির এক অচেনা নারী দুই পুত্র ও দুই কন্যাকে নিয়ে চুপচাপ ঠাকুরদালানে ঢুকছেন। মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেলেন সেই দেবী রূপী নারী! কিছুদিন পর ছাদের কার্নিশে বসে পা দোলাতেও দেখা গেল তাঁকে। অবশেষে রামলালবাবু পেলেন স্বপ্নাদেশ। ব্যস, ২৬ নম্বর চন্দ্রনাথ স্ট্রিটে শুরু হয়ে গেল মহামায়ার আবাহন।
কিন্তু এই পুজোর আসল চমক অন্য জায়গায়। সময়টা যখন উনবিংশ শতক, দেশে তখন ব্রিটিশদের জুলুম তুঙ্গে। স্বাধীনতার তাগিদ আর স্বদেশী চেতনার আগুনে ফুঁসছে বাংলা। ঠিক সেই সময়েই অভিনব এক প্রতিবাদ বেছে নিল দে পরিবার। অসুর রূপী অশুভ শক্তিকে রূপ দেওয়া হল গোরা সাহেবের! দেবীর ত্রিশূলের সামনে ধরাশায়ী বুট-কোট পরা সাহেব। ইংরেজদের সেই অপশাসন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে অনমনীয় প্রতিবাদের যে সলতে দে পরিবার জ্বালিয়েছিলেন, তা দেড়শো বছর পরেও বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। আজও ভবানীপুরের সেই প্রাচীন দালানে একই রূপে ধরা দেন মা দুর্গা।

দে বাড়ির পুজোয় রয়েছে আরও অনেক স্বতন্ত্র ছোঁয়া। প্রতিমার বাহন সিংহটির গায়ের রং কিন্তু হলুদ নয়, ধবধবে সাদা। জন্মাষ্টমীর পর থেকে বাড়ির ঠাকুরদালানেই তৈরি হয় একচালার সাবেকি প্রতিমা। তবে প্রতিমার কাঠামো কিন্তু বদলায় না। প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এক কাঠের কাঠামোতেই বছর বছর ফিরে আসে মৃণ্ময়ী মূর্তি। বিসর্জনের পর সেই কাঠামো আবার গঙ্গা থেকে ঘরে ফিরিয়ে আনা হয়।
প্রতিমার সাজসজ্জাতেও পরশের ছোঁয়া থাকে বাড়ির লোকজনেরই। কুমোরের কাজ শেষ হলে পরিবারের সদস্যরা মিলে দেবীকে অলঙ্কারে সাজান। চতুর্থীর দিন নারকেল নাড়ু তৈরি থেকে শুরু করে বোধনের আগে সিঁদুরে রাঙানো অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়া— সবটাই নিজেদের হাতে। নিত্যভোগে থাকে ১৩টি লুচি ও ১৩ রকমের মিষ্টি।

আচার-অনুষ্ঠানেও রয়েছে সাবেকিয়ানার ষোলো আনা টান। অষ্টমীর সকালে কুমারী ও সধবা পুজো হয়। সেদিন বাড়ির গৃহবধূরা মাথায় আর দুই হাতে ধুনোর সরা নিয়ে প্রার্থনা জানান। সন্ধিপুজোয় ৪৮ মিনিটের মধ্যে ফল ও ২১ কেজি চালের সুবিশাল নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। সঙ্গে জ্বলে ১০৮টি প্রদীপ আর ১০৮টি পদ্মের মালা।
বিজয়া দশমীতে আজও প্রাচীন নিয়ম মানেন দে পরিবারের সদস্যরা। জল-আয়নাই ফুটিয়ে তোলে দেবীর চরণচ্ছবি। বরণ আর সিঁদুর খেলার পর দেবী বিদায় নেন। কিন্তু সেখানেও নেই কোনও আধুনিকতার ছোঁয়া। আজও কাঁধে বাঁশ বেঁধে, হেঁটে গিয়েই গঙ্গার জলে বিসর্জন দেওয়া হয় মা দুর্গাকে। তার পর আবার ফিরে আসে সেই প্রাচীন কাঠামো, শুরু হয় আগামী বছরের দিনগোনা ..
